সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় আমানত উত্তোলনের কার্যক্রম দ্বিতীয় দিনেও স্বাভাবিকভাবে চলেছে। সোমবার ও মঙ্গলবার—দুই দিনে ব্যাংকটির ১৪ হাজার গ্রাহক তাঁদের আমানত থেকে মোট ৬৭০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। তবে টাকা উত্তোলনের জন্য জমা পড়া আবেদনের তুলনায় বাস্তবে অর্থ তুলে নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা এবং উত্তোলনের পরিমাণ—দুটিই ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ওই দুই দিনে মোট ৩৭ হাজার ৬০০ গ্রাহক ২ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে ১৪ হাজার গ্রাহক শেষ পর্যন্ত তাঁদের আমানত তুলে নেন। মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিনে টাকা উত্তোলনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। প্রথম দিন বিভিন্ন কারণে যেসব গ্রাহক ব্যাংকে আসতে পারেননি, তাঁদের অনেকে দ্বিতীয় দিন শাখায় এসে অর্থ তুলেছেন। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করেছে বলেও জানান তিনি।
আবেদন ও প্রকৃত উত্তোলনের ব্যবধানটি ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে। দুই দিনে ৩৭ হাজার ৬০০ গ্রাহক টাকা উত্তোলনের আবেদন করলেও বাস্তবে অর্থ নিয়েছেন ১৪ হাজার জন। অর্থাৎ আবেদন করা সবাই তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের অর্থ তুলে নেননি।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবেদুর রহমান সিকদার জানান, আবেদনকারীদের তুলনায় বাস্তবে আমানত তুলে নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা অনেক কম। অনেক গ্রাহক ব্যাংকের সামগ্রিক লেনদেন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শেষ পর্যন্ত টাকা না তুলেই ফিরে যাচ্ছেন। একই সময়ে বিভিন্ন শাখায় নতুন করে আমানত হিসাব খোলার ঘটনাও ঘটছে বলে তিনি জানান।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার মাধ্যমে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত হয়ে নতুন এই ব্যাংকটি গঠন করেছে। পাঁচ ব্যাংকের শাখাগুলো একত্র হওয়ায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মোট শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬১টি।
একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনের আবেদনও বিপুল। এখন পর্যন্ত মোট ৭৪ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদনের বিপরীতে গ্রাহকদের মোট ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের দাবি রয়েছে। ফলে সামনে আরও বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তির বিষয়টি ব্যাংকটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত রোববার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করে। এরপর সোমবার সকালে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শাখায় অর্থ পাঠানো হয়। এর ফলে শাখাগুলোতে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়।
মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও মালিবাগ এলাকার বিভিন্ন শাখায় গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই নিজেদের সঞ্চয়ের টাকা তুলতে ব্যাংকে আসছেন গ্রাহকেরা। দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখা অর্থ হাতে পাওয়ার জন্য অনেকেই শাখায় অপেক্ষা করেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় টাকা তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
অর্থ হাতে পাওয়ার পর গ্রাহকদের অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকের শাখাগুলোতে নিয়মিত লেনদেন চলতে থাকায় তাঁদের মধ্যে সন্তোষও দেখা গেছে।
দুই দিনের হিসাব অনুযায়ী, ৩৭ হাজার ৬০০টি আবেদনের বিপরীতে ২ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা চাওয়া হলেও প্রকৃত উত্তোলন হয়েছে ৬৭০ কোটি টাকা। আবার পাঁচটি একীভূত ব্যাংকের হিসাবে মোট ৭৪ হাজার আবেদন এবং ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকার উত্তোলন দাবি রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক আবেদন পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তি করা এবং একই সঙ্গে দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখাই এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম প্রধান বিষয়।
ব্যাংকটির শাখা নেটওয়ার্ক বড় হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় অর্থের চাহিদা একরকম নয়। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে অর্থ সরবরাহের পাশাপাশি কোন শাখায় কতটা অর্থ প্রয়োজন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে। আগামী দিনগুলোতে উত্তোলনের আবেদন কত দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং গ্রাহকদের লেনদেনের প্রবাহ কীভাবে থাকে, তার ওপর ব্যাংকটির কার্যক্রমের পরবর্তী চিত্র অনেকটাই নির্ভর করবে।


