দেশের দুর্বল আর্থিক ভিত্তির পাঁচটি ইসলামী শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংককে একত্রিত করে একটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এই নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার ২০০ কোটি টাকা সরকার মূলধন হিসেবে দেবে এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে আমানত বীমা তহবিল ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে। এই একীভূতকরণের প্রক্রিয়া আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে চায় সরকার।
একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত ও তহবিল
রবিবার (৭ সেপ্টেম্বর) অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ ব্যাংককে একত্রিত করে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়, যা আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সম্মতি পেয়েছে।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে নতুন ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় ৩৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বাজেট থেকে এবং ২০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঅর্থায়ন তহবিল থেকে আসবে। এছাড়া, আমানত বীমা তহবিল থেকে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হবে এবং বাকি ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের আমানতের ১০ শতাংশ শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।
ব্যাংকের আপত্তির মুখে সরকারের অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ইতোমধ্যে তারা পাঁচ ব্যাংকের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে। এর মধ্যে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়ে আপত্তি জানালেও বাকি তিনটি ব্যাংক সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, এই দুটি ব্যাংক পর্যাপ্ত মূলধন সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে এবং নতুন করে তাদের আর কোনো আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে না। তাই তাদের সুবিধার্থেই একীভূতকরণের আওতায় আনা হচ্ছে।
বাস্তবায়ন কৌশল ও কমিটি গঠন
এই কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহম্মদের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির প্রধান কাজ হবে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য লাইসেন্স, নিবন্ধনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করা। ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহম্মদ বলেন, আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অধিকাংশ কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় আমানতকারী ও কর্মীদের স্বার্থ শতভাগ নিশ্চিত করা হবে।
খেলাপি ঋণ ও আর্থিক সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ। এর ফলে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৮ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৬২ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর আগে, এক্সিম ব্যাংককে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ৭ হাজার ৫০ কোটি টাকা, এসআইবিএলকে ৬ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন ব্যাংকের পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সরকারের সম্মতি পাওয়ার পর নতুন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের পক্ষে এর কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রাথমিকভাবে তিন থেকে পাঁচ বছর এটি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পরিচালিত হবে এবং পরবর্তীতে বেসরকারি খাতে বিক্রি করে দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক বহুজাতিক কোনো সংস্থা এর মালিকানায় যুক্ত হতে পারে। নতুন ব্যাংকে কর্মী ছাঁটাই না করে গ্রামীণ এলাকায় নতুন শাখা খোলা হবে এবং সংগৃহীত আমানতের বেশির ভাগ সেই এলাকাতেই বিনিয়োগ করা হবে।
খবরওয়ালা/টিএসএন



