অনুবাদ: নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর
প্রকাশ: সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বিদ্বেষের চাইতেও মূর্খতা কল্যাণের বিপদজ্জনক শত্রু। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যায়; তাকে উন্মোচিত করাও যায় এবং প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে ঠেকানোও যায়।
অশুভ শক্তি সবসময় নিজের ভেতরে আত্মধ্বংসের জীবাণু বহন করে, আর সেটা মানুষের মনে অস্বস্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে। কিন্তু মূর্খতার বিরুদ্ধে আমরা সবসময় অরক্ষিত। এর বেলায় প্রতিবাদ বা বলপ্রয়োগ কোনো কাজেই আসে না। এর বিরুদ্ধে যুক্তি কারো কানে পৌঁছায় না; প্রমাণক উপস্থিত করা হলে এর বিরুদ্ধে পূর্বধারণাগত বিশ্বাসই যথেষ্ট বলে গণ্য করা হয়; এমনকি, প্রমাণক যখন অখ-নীয় তখন সেটাকে গুরুত্বহীন বা অপ্রাসঙ্গিক বলে পাশে সরিয়ে রেখে দেওয়া হয়। মূর্খ মানুষ বিদ্বেষী মানুষের মতো নয়, তারা সম্পূর্ণরূপে আত্মতুষ্ট থাকে এবং তুচ্ছ কারণেই বিরক্ত ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এজন্য বিদ্বেষপরায়ণ মানুষের সাথে আচরণের সময় যতটা সাবধানতার প্রয়োজন হয় মূর্খ মানুষের সঙ্গে আচরণ করার সময় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। যুক্তি দিয়ে মূর্খ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করা অর্থহীন এবং বিপজ্জনক।
যদি আমরা মূর্খতা থেকে রক্ষা পেতে চাই তাহলে এর প্রকৃতি অনুধাবন করার বিকল্প নেই। নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, মূর্খতা কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতি নয়, বরং মানবিক দুর্বলতা। অনেক মানুষ আছেন যারা বুদ্ধিতে প্রখর কিন্তু আদতে মূর্খ; আবার অনেকে বুদ্ধিমত্তায় অনুজ্জ্বল, কিন্তু আবার মূর্খও। আমরা প্রায়শই বিশেষ পরিস্থিতিতে সবিস্ময়ে এরকমটা অবলোকন করি। ধারণা করা যায় যে, মূর্খতা কোনো জন্মগত ত্রুটি নয়, বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে মূর্খতা চাঙ্গা হয়ে ওঠে বা নিজেকে মূর্খ হতে দেয়। আরও লক্ষ্য করা যায় যে, যারা নিজেরা নিজেদের আলাদা করে রাখে বা নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে, তাদের মধ্যে মূর্খতা তুলনামূলকভাবে কম; আর যারা গোষ্ঠীবদ্ধ বা সামাজিক জীবনে আবদ্ধ, তাদের মধ্যে মূর্খতা বেশি। সুতরাং ধারণা করা যায় যে, মূর্খতা যতটা না মানসিক তার চাইতে বেশি সামাজিক সমস্যা। মূর্খতা মূলত মানুষের ওপর বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতির প্রভাব, কিছু বাহ্যিক ঘটনাবলির প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মানসিকভাবে অনুষঙ্গী হওয়া।
আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, যখনই জনপরিসরে শক্তির জোয়ার ওঠে, তা রাজনৈতিক বা ধর্মীয় যাই হোক, তখন মানুষের এক বৃহৎ অংশ মূর্খতায় আক্রান্ত হয়। তখন মনে হয়, এটি যেন এক প্রকার সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক আইনে পরিণত হয়ে গেছে। শক্তিমানের টিকে থাকার জন্য অন্যদের মূর্খতার দরকার হয়। এ পরিস্থিতিতে মানুষ ক্ষমতাহীন হয়ে যায় না বা ব্যর্থ হয়ে যায় না; বরং উদীয়মান শক্তির প্রবল আচ্ছনতায় মানুষ তার অন্তর্গত কমবেশি সচেতনভাবেই স্বাধীন অবস্থান বিসর্জন দেয় এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়।
মূর্খ মানুষ প্রায়শই একগুঁয়ে হয়; কিন্তু তার স্বাধীনতার ঘাটতির বিষয়টা আমাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। তার সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায় যে, সে আসলে ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং স্লোগান, বাগাড়ম্বর আর মুখস্থকরা কতিপয় বাক্য তার ভেতরটা দখল করে নিয়েছে। সে যেন জাদুবশীভূত, অন্ধত্ব বরণ করেছে, কারো দ্বারা ব্যবহৃত এবং অপব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে সে মগজহীন উপকরণে পরিণত হয়েছে; তখন ঐ মূর্খব্যক্তি যে কোনো অপকর্ম করে ফেলতে সক্ষম হয় এবং একইসঙ্গে দেখার ক্ষমতাও থাকে না যে সে যা করছে সে কাজটি নিন্দনীয়। এমন পর্যায়ে মূর্খতার নারকীয় অপব্যবহারের আশঙ্কা লুকায়িত থাকে, যার বহিঃপ্রকাশ মানুষের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
আর এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নির্দেশ নয়, মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা ও সুচিন্তিত কর্মকা- দিয়েই শুধু মূর্খতাকে অতিক্রম করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় আভ্যন্তরীণ মুক্তি সম্ভব হয় বহিরাগত মুক্তি এগিয়ে আসার পর। আর ততক্ষণ পর্যন্ত মূর্খ মানুষকে বোঝানোর সব প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করতে হবে। বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে যে, এমন পরিস্থিতিতে “জনগণ” আসলে কী চিন্তা করে তা জানবার চেষ্টা অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং এ প্রশ্ন দায়িত্বশীল চিন্তা ও কর্মে নিয়োজিত মানুষের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।
তবুও, মূর্খতা নিয়ে চিন্তাভাবনা জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে মূর্খ ভেবে বসতে আমাদের কঠোরভাবে নিষেধ করে, যারা আসলে পরিস্থিতির শিকার। প্রকৃত ভাবনার বিষয় হলো, শাসকেরা জনগণের মূর্খতার ওপর বেশি ভরসা করছে, নাকি তাদের অন্তর্নিহিত স্বাধীনতা ও প্রজ্ঞার ওপর।
মূল লেখক পরিচিতি: ডিয়েট্রিখ বনহোফার (জন্ম: ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯০৬, মৃত্যু: ৯ এপ্রিল, ১৯৪৫, ফ্লোসেনবার্গ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, জার্মানি)। একজন জার্মান লুথেরান যাজক, ধর্মতত্ত্ববিদ এবং নাৎসি-বিরোধী ভিন্নমতাবলম্বী যিনি কনফেসিং চার্চের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তাঁর ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত বই “দ্য কস্ট অফ ডিসাইপলশিপ”কে আধুনিক ক্লাসিক হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
খবরওয়ালা/এমএজেড