খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা নিজের জীবনকে নিঃশব্দে নিবেদন করে যান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে। আলোকবর্তিকার মতো তাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ে সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে। তেমনি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন বেণীমাধব দাস—শিক্ষাব্রতী, চিন্তাবিদ ও একাগ্র দেশপ্রেমিক।
১৮৬৬ সালের ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামের শেওড়াতলী গ্রামে জন্ম তাঁর। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন জ্ঞানপিপাসু, ভাবুক ও নিষ্ঠাবান। দর্শনশাস্ত্রে এম.এ পাস করে ১৮৯৪ সালে যোগ দেন চট্টগ্রাম কলেজে। দর্শন, অর্থনীতি, ন্যায়শাস্ত্র কিংবা ইতিহাস—যে বিষয়ই পড়াতেন, তাঁর কণ্ঠে শুধু বিদ্যার আলো নয়, বয়ে যেতো দেশপ্রেম ও মানবিকতার স্রোত।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু তাঁর শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না—তিনি ছাত্রদের মননে রোপণ করেছিলেন সততা, আত্মত্যাগ আর দেশপ্রেমের বীজ। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন যুগস্রষ্টা শিক্ষক।
কটকের র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে পড়তেন এক তরুণ, নাম সুভাষচন্দ্র বসু। সুভাষের কিশোর মনকে সবচেয়ে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিলেন তাঁর প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাস। পরে নেতাজী লিখেছিলেন—
“শিক্ষকদের মধ্যে একজনই মাত্র আমার মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন, তিনি হলেন আমাদের প্রধান শিক্ষক শ্রদ্ধেয় বেণীমাধব দাস।”
এই একটি স্বীকৃতিই যেন বলে দেয়, বেণীমাধব দাস কেমন শিক্ষক ছিলেন। শরৎচন্দ্র বসু, ডাক্তার রাম অধিকারী, তপোগোপাল মুখার্জি—অসংখ্য গুণীজ্ঞানী তাঁর ছাত্র হয়ে ইতিহাসে আলো ছড়িয়েছেন।
তবে তিনি শুধু শিক্ষক নন, ছিলেন সমাজসংস্কারকও। যৌবনেই ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করে কেশবচন্দ্র সেনের আদর্শে দীক্ষিত হন। Indian Messenger ও Nababidhan পত্রিকার সম্পাদনায় তাঁর প্রখর চিন্তাশক্তি ফুটে উঠেছিল। ১৯২৩ সালে মাদ্রাজে All India Theistic Conference-এর সভাপতি হয়ে তিনি যে বক্তৃতা দেন, তা পরে Modern Theistic Movement in India নামে প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখা Pilgrimage through Prayers আজও স্মরণীয়।
তাঁর পরিবারও ছিল সমাজসেবায় নিবেদিত। স্ত্রী সরলা দেবী নারীর মুক্তি ও কল্যাণে কাজ করে গেছেন, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সরলা পুণ্যাশ্রম। আর তাঁদের দুই কন্যা—ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী বীণা দাস ও সংগ্রামী কল্যাণী দাস—বাবার আদর্শের আলোয় দীক্ষিত হয়ে দেশমাতৃকার টানে জীবন উজাড় করে দেন।
১৯৫২ সালের ২ সেপ্টেম্বর নিভে যায় এই মহীরুহের জীবনপ্রদীপ। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলোকশিখা আজও জ্বালিয়ে রাখে সত্যিকার শিক্ষা ও দেশপ্রেমের পথ।
বেণীমাধব দাস ছিলেন না কেবল এক শিক্ষক; তিনি ছিলেন এক যুগের প্রেরণা, এক অনন্ত জ্যোতি, যাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
‘শিক্ষা মানে কেবল বিদ্যা নয়, শিক্ষা মানে আত্মার জাগরণ, চরিত্রের নির্মাণ আর দেশের প্রতি অটল ভালবাসা।’