খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে মাঘ ১৪৩২ | ২৬ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশে মাদক ব্যবহার আর গোপন কোনো সমস্যা নয়। এটি এখন একটি দৃশ্যমান জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের এক সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণায় জানা গেছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক সেবন করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা (ক্যানাবিস), যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ ৮০ হাজার।
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) আয়োজিত রোববারের (২৫ জানুয়ারি) অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণাটি বিএমইউ ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে সম্পন্ন করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের ৮টি বিভাগ, ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলা জুড়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড ব্যবহার করে।
| বিভাগ | মাদক ব্যবহার হার (%) | ব্যবহারকারী সংখ্যা (লাখ) |
|---|---|---|
| ঢাকা | 5.6 | 22.90 |
| চট্টগ্রাম | 5.5 | 18.79 |
| রংপুর | 6.0 | 10.80 |
| ময়মনসিংহ | 6.02 | 7.35 |
| খুলনা | 4.08 | 4.60 |
| রাজশাহী | 2.72 | 2.40 |
| বরিশাল | 4.2 | 3.10 |
| সিলেট | 4.5 | 3.01 |
গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। এরপরের অবস্থায় আছে ইয়াবা/মেথামফেটামিন (২৩ লাখ), অ্যালকোহল (২০ লাখ), কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইন। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার, যাদের মধ্যে এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
একজন মাদক ব্যবহারকারী গড়ে মাসে প্রায় ৬ হাজার টাকা মাদকের জন্য ব্যয় করেন এবং একই ব্যক্তি একাধিক ধরনের মাদক সেবন করতে পারে। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮–১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮–২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করে।
মুখ্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বেকারত্ব, বন্ধুমহলের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও অনানুষ্ঠানিক পেশা। আশঙ্কাজনকভাবে প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন—মাদক সহজে পাওয়া যায়।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিয়েও হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। মাত্র ১৩ শতাংশ ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। তবে মাদক ব্যবহারকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন (৬৯%), কাউন্সেলিং (৬২%) এবং কর্মসংস্থান সহায়তা (৪১%) সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, “মাদকাসক্তরা শুধু অন্য কেউ নয়, আমরা এবং আমাদের সন্তানরাও ঝুঁকির মধ্যে আছি। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই বিপদ মোকাবিলা করতে হবে।”
ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, “পরিবার থেকেই মাদক প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। ঢাকা ছাড়াও সাত বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।”
গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, মাদক সমস্যার সমাধান শুধু আইনশৃঙ্খলার মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।