খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার আলোচিত শতবর্ষী অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লা ইন্তেকাল করেছেন। রোববার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজ বাসভবনে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ১২০ বছর। পরদিন সোমবার (৬ এপ্রিল) সকাল ৯টায় বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আব্দুর রহমান মোল্লা বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। জীবনের শেষ দুই দশক তিনি দৃষ্টিশক্তিহীন অবস্থায় অতিবাহিত করলেও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে কখনো পিছপা হননি। ২০২৪ সালের মে মাসে তার অসাধারণ জীবনসংগ্রাম গণমাধ্যমে উঠে এলে তিনি দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। বিশেষ করে দড়ি ও বাঁশ ধরে প্রতিদিন মসজিদে গিয়ে আজান দেওয়ার দৃশ্য মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২২ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। তবে এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার মনোবলকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং তিনি আরও দৃঢ় প্রত্যয়ে ধর্মীয় জীবনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। দৃষ্টিশক্তি হারানোর কয়েক বছর পর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন। হজ থেকে ফিরে এসে তিনি ইসলামের সেবায় নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন।
নিজস্ব উদ্যোগে তিনি নিজের পাঁচ শতাংশ জমির ওপর একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন এবং সেটি মসজিদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেই ওই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তবে বাড়ি থেকে মসজিদের দূরত্ব প্রায় ২০০ মিটার হওয়ায় দৃষ্টিহীন অবস্থায় যাতায়াত তার জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে তিনি নিজেই অভিনব এক উপায় বের করেন। তার নির্দেশনায় পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তার পাশে দড়ি ও বাঁশ স্থাপন করেন। প্রথমদিকে নাতিদের সহযোগিতায় পথচলা শুরু হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সম্পূর্ণ স্বনির্ভরভাবে যাতায়াত করতে সক্ষম হন। একটি লাঠি এবং সেই দড়ি-বাঁশের সহায়তায় তিনি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে মসজিদে গিয়ে আজান দিতেন। তার এই অবিচল নিষ্ঠা ও আত্মনির্ভরতা স্থানীয়দের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠে।
নিচে তার জীবনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | আব্দুর রহমান মোল্লা |
| বয়স | প্রায় ১২০ বছর |
| বসবাস | বড়দেহা গ্রাম, বড়াইগ্রাম, নাটোর |
| পেশা/দায়িত্ব | মুয়াজ্জিন |
| দৃষ্টিশক্তি হারান | প্রায় ২২ বছর আগে |
| মসজিদে যাতায়াত | দড়ি ও বাঁশ ধরে |
| বিশেষ অবদান | নিজ জমিতে মসজিদ নির্মাণ ও দান |
তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ। শোকবার্তায় তিনি বলেন, “আব্দুর রহমান মোল্লা অন্ধত্বকে জয় করে যে দৃঢ়তা ও একাগ্রতার সঙ্গে দ্বীনের পথে কাজ করে গেছেন, তা সমাজের জন্য এক অনন্য উদাহরণ।” তিনি আরও বলেন, এমন নিবেদিতপ্রাণ মানুষের মৃত্যুতে বড়াইগ্রামবাসী একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বকে হারাল।
স্থানীয়রা জানান, আব্দুর রহমান মোল্লা শুধু একজন মুয়াজ্জিনই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে নিজের দায়িত্ব পালনের যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।
তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাস থাকলে কোনো বাধাই মানুষকে থামাতে পারে না। তার বিদায়ে এক নিঃশব্দ শূন্যতা তৈরি হলেও, তার কর্ম ও আত্মত্যাগ চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।