নদীতে ভাসমান জীবন

ভোলার মেঘনা নদীর বুকে নৌকায় ভাসমান জীবন কাটায় বেদে ও মানতা সম্প্রদায়ের মানুষেরা। নৌকাতেই তাদের জন্ম, সংসার এবং মৃত্যু। তাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই, বিশুদ্ধ পানির অভাব, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত।

বছরের পর বছর ধরে সীমাহীন বঞ্চনার শিকার হয়েও তারা নদীর ঢেউয়ের সাথে টিকে আছেন। ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে মেঘনা নদীর জোড়খালে প্রায় দেড়শ পরিবার বসবাস করে। মাছ ধরা তাদের একমাত্র পেশা হলেও স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় তারা জেলে হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারেন না, ফলে সরকারি সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি নৌকায় ৫ বছরের নিচে অনেক শিশু রয়েছে, যাদের নিরাপত্তার জন্য কোমরে দড়ি বাঁধা। একটি নৌকায় রোজিনা বেগম তার সন্তানদের জন্য রান্না করছিলেন। আরেকটিতে এক মা তার কোমরে বাঁধা দড়ির সাথে সন্তানের কোমরের দড়ি বেঁধে মাছ ধরছিলেন। বাসিন্দারা জানান, তারা নদীর পানি ফিটকি দিয়ে পান করেন এবং একই পানি গোসল ও থালা-বাসন ধোয়ার কাজে ব্যবহার করেন। টয়লেটের কাজও নদীতেই সারেন।

বেদেরা অভিযোগ করেন, জোড়খালে থাকার জন্য তাদের চাঁদা দিতে হয়। সরদার আব্দুর রহিম জানান, তারা নৌকায় ধর্মীয় কোনো অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন না। সম্প্রতি গড়ে ওঠা একটি স্কুলের পাশে ছোট একটি ঘরে নামাজের ব্যবস্থা হয়েছে, যেখানে মসজিদের ইমাম আশরাফ উদ্দিন নামাজ পড়ান।

ঝড়-তুফানের সময় জোড়খালের পাশাপাশি অন্য খালে নৌকা রাখতে গেলেও এলাকার প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী নৌকা প্রতি ১ থেকে ৩ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করে।

আদাই সরদার, মো. মিরাজ সরদার, মো. হাবিব সরদার ও ফরিদ সরদার জানান, তারা গত ৫০ বছর ধরে এই এলাকায় আছেন। ভোলার জোড়খাল এখন তাদের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে উঠেছে। তারা মনে করেন, সরকার যদি এখানে একটি বেদেপল্লী তৈরি করে, তবে তাদের স্থায়ী ঠিকানা হবে।

স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী আমির হোসেন তার নিজস্ব উদ্যোগে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নদীপাড়ে একটি টিনের ঘর তৈরি করেছেন, যেখানে তার স্ত্রী পড়ান। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি শিশু পড়তে আসে। মসজিদের ইমাম তাদের আরবি শিক্ষা দেন। শিশুদের খেলার কোনো ব্যবস্থা নেই, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে গোসল করাই তাদের একমাত্র খেলা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, বর্তমানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে, তাই এই সম্প্রদায়ের পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প চিন্তাভাবনা চলছে। তিনি জানান, প্রথম ধাপে ৫০টি ঘর তৈরি করা গেলে ৫০টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে এবং সরকারের খাস জমিতে বেদেপল্লী তৈরির জন্য জমিও খোঁজা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, তিনি তাদের জন্য স্কুলের পাশে একটি টিউবওয়েল বসানোর ব্যবস্থা করবেন এবং চাঁদা আদায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখবেন।

খবরওয়ালা/টিএসএন

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।