নাটোরে মাছ ব্যবসায়ীকে স্ত্রী ও সন্তানের হাতে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন

নাটোরের সিংড়ায় চাঞ্চল্যকর মাছ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম (৪৫) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের স্ত্রী শিউলি বেগম (৩৫) এবং তার ছেলে সাইফুদ্দিন সিদ্দিক ওরফে রয়েলকে (২৩) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে মোড় দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পুলিশের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখে আসামিরা অপরাধ স্বীকার করেছেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রাথমিক বিবরণ

গত সোমবার ভোরে নাটোরের সিংড়া উপজেলায় মাছ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের গলাকাটা মরদেহ তার নিজ ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং নিহতের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। রফিকুলের স্ত্রী শিউলি বেগম শুরুতে দাবি করেছিলেন যে, ভোরে নামাজ পড়ার জন্য ঘুম থেকে উঠে তিনি পাশের ঘরে স্বামীর রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান। তিনি আরও জানান যে, আগের রাতে তিনি স্বামীকে খাবার খাইয়েছিলেন এবং মাথায় তেল মালিশ করে দিয়েছিলেন।

তবে পুলিশ কর্মকর্তাদের সন্দেহ হওয়ায় তারা শিউলি বেগম ও তার ছেলে রয়েলকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা অসংলগ্ন তথ্য প্রদান করেন এবং শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন যে, তারা মা ও ছেলে মিলে পরিকল্পিতভাবে রফিকুলকে হত্যা করেছেন।

উদ্ধারকৃত আলামত ও জবানবন্দি

আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলের পাশে অবস্থিত একটি পুকুরে অভিযান চালায়। সেখান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাপাতি এবং আসামিদের পরিহিত রক্তমাখা পোশাক উদ্ধার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শিউলি বেগম জানান, তার স্বামী রফিকুল ইসলাম মাদকাসক্ত ছিলেন এবং প্রায়ই তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। এই দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরেই তিনি ছেলের সহযোগিতায় স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

মামলার বিবরণ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ

নিচে এই হত্যাকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত তথ্য সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

বিষয় বিস্তারিত তথ্য
নিহতের নাম রফিকুল ইসলাম (৪৫)
পেশা মাছ ব্যবসায়ী
গ্রেপ্তারকৃত আসামি শিউলি বেগম (স্ত্রী) ও সাইফুদ্দিন সিদ্দিক রয়েল (ছেলে)
হত্যাকাণ্ডের স্থান নিহতের নিজ বসতঘর
উদ্ধারকৃত অস্ত্র একটি চাপাতি
অন্যান্য আলামত রক্তমাখা জামাকাপড় (পুকুর থেকে উদ্ধার)
মামলার বাদী নিহতের ভাই ফারুক হোসেন
আইনি প্রক্রিয়া হত্যা মামলা দায়ের ও আদালতে প্রেরণের প্রস্তুতি

পুলিশের বক্তব্য ও বর্তমান অবস্থা

সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, পুলিশ খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রাথমিকভাবে পরিবারের সদস্যরা একটি ‘মিথ্যা গল্প’ সাজিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও বিজ্ঞানসম্মত জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তারা প্রকৃত ঘটনা স্বীকার করতে বাধ্য হন।

নিহত রফিকুলের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নাটোর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহতের ভাই ফারুক হোসেন বাদী হয়ে সিংড়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। আসামিদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং তারা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

স্থানীয় এলাকাবাসীর মতে, রফিকুলের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তবে পারিবারিক এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও মাদকাসক্তির প্রভাব ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ মামলার তদন্ত কাজ চলমান রেখেছে এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো মদতদাতা আছে কি না তাও খতিয়ে দেখছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।