খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটি উদযাপিত হচ্ছে এমন একটি সময়, যখন একসময়ে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশ এখন উল্টো পথে হাঁটছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশের শ্রমবাজারে নারী অংশগ্রহণ কমছে, উচ্চশিক্ষায় নারীর সংখ্যা পিছিয়ে পড়ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি অপ্রতুল এবং নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতাগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য—‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’। প্রধানমন্ত্রী নারীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তি ২০২৪ সালে ৭.১৭ কোটি, যেখানে ২০২৩ সালে ছিল ৭.৩৪ কোটি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে ১৭ লাখ শ্রমিক কমেছে, যার বড় অংশ নারী শ্রমিক। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ হ্রাসের পেছনে পারিবারিক দায়িত্ব, মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার সমস্যা, নিরাপদ পরিবহণের অভাব এবং নারীবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি মূল কারণ।
| ক্ষেত্র | ২০২৩ | ২০২৪ | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| মোট শ্রমশক্তি | ৭.৩৪ কোটি | ৭.১৭ কোটি | -১৭ লাখ |
| নারী শ্রমিক | – | – | উল্লেখযোগ্য হ্রাস |
| রপ্তানি পোশাক খাত | ৮০% নারী | কমছে | ধীরে ধীরে কমছে |
প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ৫১.২১%, মাধ্যমিকে বেড়ে ৫৪.৮৪% হলেও উচ্চমাধ্যমিকে কমে ৫০.৭৫% এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারীর সংখ্যা ৪৭%। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর অনুপাত ৫২ ও ৪৮ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও কম।
কারিগরি শিক্ষা এবং গবেষণা ক্ষেত্রেও নারীর উপস্থিতি সীমিত। দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি, নিরাপদ পরিবহণের অভাব এবং আবাসিক সুযোগের সংকট উচ্চশিক্ষায় নারী অংশগ্রহণ কমাচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪%, যেখানে ৮৫ নারী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ৭ জন। একশন এইড বাংলাদেশ জানায়, নির্বাচনি কাঠামোগত বাধা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং সাইবার বুলিং নারী নেতৃত্বকে বাধাগ্রস্ত করছে।
২০২৫ সালে ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতা ২০২৪ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। জাতিসংঘের ইউএনএফপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫১% মেয়ে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে করছে, অনেকেই খুব কম বয়সে মা হচ্ছেন।
নারী অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন শুধু বেতন বা চাকরির বৃদ্ধি নয়, এটি আরও ব্যাপক ও মৌলিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। নারীকে সম্মান দেওয়া, নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং নীতি প্রণয়নে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণই প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে।
আজকের দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, নারীর অধিকার ও সমান সুযোগের জন্য আমাদের সামাজিক, শিক্ষামূলক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের কাজ এখনই ত্বরান্বিত করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়, সমগ্র জাতির উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।