খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৫৮ পিএম
রাজধানীর ফুটপাত ও রাজপথে ব্যবসা পরিচালনায় শৃঙ্খলা আনতে এবার নিবন্ধনের আওতায় আসছেন হকাররা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকাভুক্ত ফুটপাতে ইচ্ছেমতো বসে আর ব্যবসা করা যাবে না; বরং নির্ধারিত স্থান ও সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তাদের কেনাবেচা সম্পন্ন করতে হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম হকার প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় সভায় প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালার বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করেছেন।
নগর ভবনে আয়োজিত এই বৈঠকে ডিএসসিসি প্রশাসক স্পষ্ট করেন যে, হকারদের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধা, নিরাপদ নগরী গড়ে তোলা এবং যানজট নিরসনই এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য।
কী থাকবে প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালায়?
প্রস্তাবিত নীতিমালা কার্যকর হলে নিবন্ধিত প্রতিটি হকারকে কিউআর কোড ও বারকোডসংবলিত বিশেষ পরিচয়পত্র বা ডিজিটাল লাইসেন্স দেওয়া হবে। এই লাইসেন্স দেখিয়ে হকাররা নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করতে পারবেন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা ট্রাফিক পুলিশ সহজেই তা স্ক্যান করে যাচাই করতে পারবে। কোনো অবস্থাতেই এই লাইসেন্স অন্য কারো কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করা যাবে না। এমনকি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ব্যবসার ধরন কিংবা স্টলের আকারও বড় করা যাবে না।
নীতিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধনের প্রাথমিক ফি নির্ধারণ করা হয়েছে এককালীন ৫ হাজার টাকা এবং প্রতি বছর নবায়ন ফি দিতে হবে ২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া সিটি কর্পোরেশনের জায়গা ব্যবহার, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার খরচ বাবদ প্রতি মাসে হকারপ্রতি ৩ হাজার টাকা ফি ধার্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
নিবন্ধন পাওয়ার মূল শর্ত হিসেবে আবেদনকারীর বয়স অন্তত ১৮ বছর এবং বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। আবেদনের এক মাসের মধ্যে খালি থাকা সাপেক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে কর্তৃপক্ষ। তবে একটি পরিবারের জন্য কেবল একটিই লাইসেন্স বরাদ্দ করা হবে। নিবন্ধিত সকল হকারের হালনাগাদ তালিকা পরবর্তীতে ওয়েবাসাইট ও নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করা হবে, যেন পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ ও চলাচলের জন্য ৫-৬ ফুট ফাঁকা রাখার শর্ত
লাইসেন্সধারী হকারদের জন্য বরাদ্দ স্থান অন্য কেউ দখল করতে পারবে না এবং ওই স্থানের নাম করে কেউ কোনো ধরনের চাঁদা দাবি করতে পারবে না বলে আশ্বস্ত করেছে ডিএসসিসি। তবে ফুটপাতে হকার বসানোর ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেসব রাস্তা ও ফুটপাতে হকার বসার পরও পথচারীদের হাটার জন্য অন্তত ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা ফাঁকা থাকবে, কেবল সেখানেই ব্যবসার অনুমতি মিলবে।
প্রধান সড়ক, মেট্রো রেল স্টেশন, বাসস্টপ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় সংলগ্ন এলাকায় কোনোভাবেই হকার বসতে দেওয়া হবে না। এ ছাড়া খেলাধুলার মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় কিংবা কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় কোনো মার্কেট বসবে না। আবাসিক এলাকাতেও হকার বসানোকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো এলাকাকে পূর্ণাঙ্গ হকারমুক্ত ঘোষণা করার একচ্ছত্র অধিকার সংরক্ষণ করবে সিটি কর্পোরেশন।
হলিডে ও নৈশকালীন মার্কেট চালুর পরিকল্পনা
সাধারণ ছুটির দিন ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নির্দিষ্ট কিছু খালি স্থানে ‘হলিডে মার্কেট’ বসানোর পরিকল্পনা করছে ডিএসসিসি। এসব মার্কেটে মূলত খাবারের পাশাপাশি হস্তশিল্প ও গৃহস্থালি পণ্য বিক্রিতে প্রাধান্য দেওয়া হবে। অন্যদিকে, দিনের বেলা ব্যস্ত কিন্তু রাতে তুলনামূলক ফাঁকা থাকে—এমন বাণিজ্যিক এলাকায় অফিস সময়ের পর ‘নৈশকালীন মার্কেট’ চালু করা হবে। এসব স্থান নির্বাচনে নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। খাদ্য বিক্রেতাদের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পুরো ব্যবস্থাপনা তদারকির জন্য পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায় কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে হকার সংগঠনের প্রতিনিধিরাও থাকবেন।
ফি কমানো ও পুনর্বাসনের দাবি হকার নেতাদের
মতবিনিময় সভায় হকার প্রতিনিধি ও নেতারা ডিএসসিসির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও প্রস্তাবিত এককালীন ৫ হাজার টাকা ও মাসিক ৩ হাজার টাকা ফি কমানোর জোর দাবি জানান। বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও জুরাইন এলাকার হকারদের দীর্ঘদিনের ব্যবসার কথা বিবেচনায় এনে সুনির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি তোলা হয়।
সংকীর্ণ ফুটপাতে ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে—তা নিয়েও প্রতিনিধিরা নিজস্ব প্রস্তাব তুলে ধরেন। ডিএসসিসি প্রশাসক তাদের বক্তব্য গুরুত্ব সহকারে শোনেন এবং একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা চূড়ান্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
মন্তব্য