নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজ হওয়া হাজার হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল। বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডুতে আয়োজিত ‘এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড অন্বেষা সম্মেলনে’ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ তথ্য জানান। নিখোঁজ ভারতীয়দের বড় একটি অংশ কৈলাস মানসসরোবর যাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
রসুয়া অঞ্চলে ভয়াবহ এই আকস্মিক বন্যার পর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠেছে। নেপালের বিভিন্ন সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট সকাল পর্যন্ত দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬২ জনে পৌঁছেছে। বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একের পর এক জনপদ ভয়াবহ পানির স্রোতে বিধ্বস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকারী দলও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সহজে পৌঁছাতে পারছে না। পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয় বলেও তিনি জানান।
বন্যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে রসুয়া ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায়। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় প্রবল স্রোতে বসতি, যানবাহন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৯টি চলাচলযোগ্য সেতু ভেসে গেছে। বেত্রাবতী থেকে রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৪২ কিলোমিটার সড়কেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে দুর্গম এলাকায় স্থলপথে উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্যোগে নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চালু থাকা কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে দুর্গত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে আরও সময় লাগতে পারে।
ভারতীয় নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রসুয়া অঞ্চলটি কৈলাস মানসসরোবর যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় ওই সময় সেখানে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বহু পর্যটক ও তীর্থযাত্রী অবস্থান করছিলেন। বন্যার আকস্মিক স্রোতে যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁদের অনেকের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নেপালের সঙ্গে সমন্বয় করে নিখোঁজ নাগরিকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
দুর্যোগের কারণ নিয়েও প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। পরবর্তী বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে হিমবাহের একটি অংশ ধসে পড়া এবং এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও পানি নদীতে নেমে আসার বিষয়টি সামনে এসেছে। সেই প্রবল স্রোত দ্রুত নদী অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ ও পুলিশ সদস্যরা উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার, চিকিৎসা সহায়তা ও ত্রাণ পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। তবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা উদ্ধার তৎপরতাকে কঠিন করে তুলছে।
নেপালের এই বিপর্যয়ে ভারত সরকার জরুরি সহায়তা পাঠিয়েছে। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে অস্থায়ী আশ্রয়ের উপকরণ, কম্বল, স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী, সৌর বাতি ও ওষুধ রয়েছে। ভারতীয় বিমানবাহিনীর মাধ্যমে এসব সহায়তা কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়েছে এবং আরও উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতায় ভারতের সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে জীবিতদের দ্রুত উদ্ধার করা, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করা এবং দুর্গত মানুষের কাছে খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় পৌঁছে দেওয়া। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তবে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্যোগের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কম।


