পটুয়াখালী সদর উপজেলায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৭ জুন, বুধবার সকালে উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়নের চৌদ্দবুড়িয়া এলাকায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত শ্রমিকেরা ওই এলাকারই বাসিন্দা এবং সম্পর্কে তাঁরা প্রতিবেশী। সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা ক্ষতিকারক গ্যাসের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার বিবরণ ও উদ্ধার অভিযান
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকালে চৌদ্দবুড়িয়া এলাকার একটি নতুন নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে সাটারিং খোলার বা অন্যান্য টেকনিক্যাল কাজ করার জন্য প্রথমে মোহাম্মদ নূহু নামের এক তরুণ শ্রমিক ভেতরে প্রবেশ করেন। ট্যাংকের ভেতরে কাজ শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে জমে থাকা গ্যাসের কারণে তিনি তীব্র শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করেন এবং একপর্যায়ে ট্যাংকের তলদেশেই অচেতন হয়ে পড়েন।
নূহুকে দীর্ঘক্ষণ অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে এবং কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বাইরে থাকা অপর শ্রমিক মোহাম্মদ আশরাফ চৌকিদার তাঁকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ট্যাংকের ভেতরে নামেন। কিন্তু ট্যাংকের ভেতরের বিষাক্ত বাতাসের কারণে তিনিও দ্রুত নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং সেখানে অচেতন হয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে আশেপাশের মানুষ ও অন্য নির্মাণশ্রমিকেরা বিষয়টি টের পান। ট্যাংকের মুখ ছোট হওয়ায় ওপর থেকে তাঁদের উদ্ধার করা সম্ভব ছিল না। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা দ্রুত সেপটিক ট্যাংকের একটি অংশ ভেঙে গর্ত তৈরি করেন এবং দুজনকে অবচেতন অবস্থায় বাইরে বের করে আনেন। তবে ট্যাংকের বাইরে এনে পরীক্ষা করার পর দেখা যায়, ততক্ষণে উভয়েরই মৃত্যু হয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ
এই ঘটনার পর পটুয়াখালী সদর থানা পুলিশকে সংবাদ দেওয়া হলে পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। স্থানীয়দের প্রাথমিক ধারণা, দীর্ঘদিনের বন্ধ ট্যাংকে জমে থাকা কার্বন মনোক্সাইড বা মিথেনের মতো বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর প্রকৃত ও সুনির্দিষ্ট কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন (পোস্টমর্টেম রিপোর্ট) হাতে পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পটুয়াখালী সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান গণমাধ্যমকে দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে এবং লাশ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে প্রেরণের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এই বিষয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিহতদের পরিচয় ও ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারণী
পটুয়াখালীর সদর উপজেলায় সেপটিক ট্যাংকে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনার সার্বিক বিবরণী ও নিহতদের পরিচয় নিচে সারণীবদ্ধভাবে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | সুনির্দিষ্ট তথ্য ও উপাত্ত |
| প্রথম নিহতের নাম ও বয়স | মোহাম্মদ নূহু (২৫ বছর) |
| পারিবারিক পরিচয় (নূহু) | পিতা: আব্দুর রাজ্জাক ফকির; গ্রাম: চৌদ্দবুড়িয়া (শিকদার বাড়ি) |
| দ্বিতীয় নিহতের নাম ও বয়স | মোহাম্মদ আশরাফ চৌকিদার (৪৫ বছর) |
| পারিবারিক পরিচয় (আশরাফ) | পিতা: তথ্য নিশ্চিত নয়; গ্রাম: চৌদ্দবুড়িয়া এলাকা |
| ঘটনার তারিখ ও সময় | ১৭ জুন ২০২৬ (বুধবার), সকাল বেলা |
| ঘটনাস্থল ও ইউনিয়ন | চৌদ্দবুড়িয়া এলাকা, কমলাপুর ইউনিয়ন, পটুয়াখালী সদর |
| প্রাথমিক অনুমিত কারণ | সেপটিক ট্যাংকের বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হওয়া |
| আইনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা | মো. মনিরুজ্জামান, অফিসার ইনচার্জ (ওসি), পটুয়াখালী সদর থানা |
নির্মাণাধীন বা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সেপটিক ট্যাংকে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করায় সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো মারাত্মক গ্যাস তৈরি হতে পারে। পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা বা অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া এই ধরনের ট্যাংকে নামার কারণে প্রায়শই এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন থেকে নির্মাণকাজের সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।



