খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পবিত্র রমজান মাসের সমাপ্তিতে মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা। ১৪৪৭ হিজরি সনের (২০২৬ সাল) জন্য জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটি জনপ্রতি ফিতরার হার ঘোষণা করেছে। এ বছর সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০৫ টাকা।
শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ১ শাওয়াল অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় যেসব মুসলমানের কাছে মৌলিক প্রয়োজন—যেমন বসতবাড়ি, ব্যবহার্য পোশাক, প্রয়োজনীয় আসবাব, জীবিকার উপকরণ—এসবের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তাদের ওপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। এটি জাকাতের মতোই একটি আর্থিক ইবাদত, তবে জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদের ওপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত; ফিতরার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়—ঈদের দিন ভোরে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই ফিতরা দিতে হবে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই সফলকাম সে, যে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে।” (সুরা আলা, আয়াত ১৪)। হাদিস শরিফে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন—এর পরিমাণ এক ‘সা’ যব অথবা এক ‘সা’ খেজুর; ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার ওপরই এটি ওয়াজিব (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫১২)।
ফিতরার মূল উদ্দেশ্য দুটি—রোজার ঘাটতি পূরণ এবং দরিদ্র মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করা। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, সদকাতুল ফিতর রোজার অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজের ক্ষতিপূরণ এবং গরিবদের খাদ্যসংস্থানের জন্য নির্ধারিত (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৬০৯)।
রাজধানী ঢাকার জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার ফতোয়া বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছর ৫২.৫ ভরি রুপার বাজারমূল্যের ভিত্তিতে জাকাত ও ফিতরার নিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, ঈদের দিন ভোরে যদি কারও কাছে এই পরিমাণ সম্পদ বা তার সমমূল্য নগদ অর্থ থাকে, তবে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। জাকাতের ক্ষেত্রে একই পরিমাণ সম্পদের মালিকানা পূর্ণ এক বছর থাকতে হবে এবং ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত আদায় করতে হবে।
খাদ্যদ্রব্যের ভিত্তিতে ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণে ‘সা’ পরিমাপ অনুসরণ করা হয়, যা আনুমানিক ৩.৩ কেজি (গমের ক্ষেত্রে অর্ধেক, অর্থাৎ প্রায় ১.৬৫ কেজি)। জামিয়া রাহমানিয়ার হিসাব অনুযায়ী ফিতরার পরিমাণ নিচে উপস্থাপন করা হলো—
| খাদ্যদ্রব্য | পরিমাণ | নির্ধারিত ফিতরা (টাকা) |
|---|---|---|
| কিসমিস | ৩.৩ কেজি | ২৮০০ টাকা |
| পনির | ৩.৩ কেজি | ২৬৫০ টাকা |
| খেজুর | ৩.৩ কেজি | ২০০০ টাকা |
| যব | ৩.৩ কেজি | ৪৫০ টাকা |
| গম/আটা | ১.৬৫ কেজি | ১০০ টাকা |
তবে জাতীয় কমিটির ঘোষণায় সর্বনিম্ন ফিতরা ১১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা স্থানীয় বাজারদরের ভিত্তিতে সামান্য তারতম্য হতে পারে। তাই আলেমদের পরামর্শ, নিজ নিজ এলাকার বাজারমূল্য যাচাই করে ফিতরা আদায় করা উত্তম।
ফিতরা আদায়ের সময়সীমা রমজানের শেষ দিন সূর্যাস্তের পর থেকে ঈদের নামাজের আগ পর্যন্ত। তবে দরিদ্রদের সুবিধার্থে ঈদের এক-দুই দিন আগেও ফিতরা প্রদান করা জায়েজ। ঈদের নামাজের পর ফিতরা দিলে তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে, ফিতরার সওয়াব পাওয়া যাবে না।
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিম নিজের পাশাপাশি তার অধীনস্থ অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকেও ফিতরা আদায় করবেন। এতে সমাজে সাম্য, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহায়তার চেতনা জাগ্রত হয় এবং ঈদের আনন্দে দরিদ্ররাও অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
ফিতরা শুধু আর্থিক দায় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও আত্মশুদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুশাসন। যথাসময়ে সঠিক পরিমাণে ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে একজন মুসলমান তার রোজার পূর্ণতা নিশ্চিত করতে পারে এবং অভাবী মানুষের মুখে ঈদের হাসি ফোটাতে ভূমিকা রাখতে পারে।