এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকিস্তানের সামনে একটি কঠিন কৌশলগত প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—নিজের অস্থির বেলুচিস্তানকে স্থিতিশীল রাখা, নাকি আঞ্চলিক মিত্রতার চাপে ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়া।
বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের জন্য আজ সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ইরান নয়; বরং নিজস্ব ভূখণ্ড, বিশেষ করে বেলুচিস্তান। বহু বছর ধরে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী, সন্ত্রাসী হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে এই অঞ্চলে হামলার সংখ্যা ও প্রাণহানি আরও বেড়েছে বলে বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তের দুই পাশেই বেলুচ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশেও অস্থিরতা বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ইসলামাবাদের কাছে ইরানের স্থিতিশীলতা কেবল প্রতিবেশী দেশের বিষয় নয়; এটি নিজের জাতীয় নিরাপত্তারও অংশ।
পাকিস্তানের সামনে আরেকটি জটিল সমীকরণ হলো—একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনায় পাকিস্তান প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালনের চেষ্টা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদ সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না; কারণ এতে তার অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এছাড়া পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে একই সময়ে ভারত সীমান্ত, আফগানিস্তান সীমান্ত এবং বেলুচিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কার্যত “দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী নিরাপত্তা সংকট” সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও পাকিস্তানকে সংযত থাকতে বাধ্য করছে। দেশটি জ্বালানি আমদানির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত বাড়লে তেলের দাম, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে পাকিস্তানের অর্থনীতি আরও সংকটে পড়বে।
সবশেষে বলা যায়, পাকিস্তানের সামনে আজ সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার বিরুদ্ধে। বেলুচিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহ, অর্থনৈতিক সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য—এসবই ইসলামাবাদকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে।
রাজনীতির ভাষায় বলা যায়—যে রাষ্ট্র নিজের ঘরের আগুন পুরোপুরি নেভাতে পারেনি, সে প্রতিবেশীর আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার আগে বহুবার হিসাব কষে। পাকিস্তানের বর্তমান কৌশলও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন।
লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক- খবরওয়ালা