তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে প্রায় ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের তৈরি পোশাক খাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির দুটি গোয়েন্দা ইউনিট সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। ওই চিঠিতে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব শনাক্ত ও জব্দ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের লেনদেনসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। এসব লেনদেনের মাধ্যমে অর্থের উৎস, গন্তব্য এবং অর্থ স্থানান্তরের ধরন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে চায় এনবিআর।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অধিকাংশই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী আবদুস সালাম মুর্শেদী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এবং সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম।
ব্যবসায়ী মহলের আরও কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির নামও তালিকায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন টুসুকা গ্রুপের ফয়জুর রহমান, ওয়েল গ্রুপের আবদুস সালাম, নিপা গ্রুপের খসরু চৌধুরী, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের মোশাররফ হোসেন এবং তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
কেন ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হচ্ছে
এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কয়েকটি সরকারি সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তাঁদের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্থ কীভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে, কোন কোন হিসাবে জমা হয়েছে এবং অর্থের সঙ্গে অভিযোগের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় এ ধরনের অভিযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এ খাত থেকে। লাখ লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশার মানুষের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শ্রমিক অসন্তোষ, সংঘাত কিংবা পরিকল্পিত অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; রপ্তানি আদেশ, বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে কারখানাগুলোতে স্থিতিশীল উৎপাদন পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। এ কারণে শিল্প খাতে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের উৎস ও ব্যবহার সম্পর্কে অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তদন্ত এখনো চলমান, বাড়তে পারে তালিকা
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন, আবার কয়েকজন পলাতক। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ বা লেনদেনের তথ্য চাওয়ার বিষয়টি নিজে থেকেই কারও অপরাধ প্রমাণ করে না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংগৃহীত আর্থিক তথ্য, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে যে তালিকা নিয়ে কাজ চলছে, সেটিকে চূড়ান্ত বলে মনে করছে না এনবিআর। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে সেগুলোও পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
তদন্ত কবে নাগাদ শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, সেগুলো বিশ্লেষণ এবং অভিযোগের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র যাচাই করতে সময় লাগতে পারে।
এদিকে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, একদিকে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন, অন্যদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের ওপর নেওয়া পদক্ষেপও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। এনবিআরের চলমান অনুসন্ধানে সংগৃহীত তথ্য শেষ পর্যন্ত কী ধরনের চিত্র তুলে ধরে, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।



