রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চার সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় উন্মোচিত হলো এক করুণ বাস্তবতার। নির্মমভাবে প্রাণ হারানো তরুণী আগামী চক্রবর্তীর ঠিকানায় আসা শেষ পার্সেলটি তাঁর হাতে আর পৌঁছায়নি। নিহত গ্রাহকের বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে ডেলিভারিম্যান যখন জানতে পারলেন পুরো পরিবারটিকেই হত্যা করা হয়েছে, তখন পার্সেলের ট্র্যাকিং পেজে লিখে দিতে হলো অশ্রুসজল এক লাইন ফিডব্যাক—‘কাস্টমার সপরিবারে নিহত হয়েছেন।’
অনলাইন কেনাকাটার এই পার্সেলটি বুক করা হয়েছিল স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম রিদওয়ানুল বারী জিয়ন ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন। তিনি সেখানে নিশ্চিত করেন যে, তাঁদের কাছে আগামী চক্রবর্তীর নামে একটি ডেলিভারি পেন্ডিং ছিল। নিহত পরিবারের সদস্যদের আত্মার শান্তি কামনা করে তিনি এই মর্মান্তিক সত্য তুলে ধরেন। কুরিয়ার কর্মীর লিখে যাওয়া সেই একটি বাক্য এখন স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও হাহাকারের সৃষ্টি করেছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার আগামী চক্রবর্তী (২৩) রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে সবেমাত্র স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছিল খুব শিগগিরই, বিয়ের দিনক্ষণও প্রায় চূড়ান্ত হয়েছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনার কিছুদিন আগে আগামীর হবু স্বামী অদিত কর ভালোবাসায় ভরপুর এক বার্তায় তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে লিখেছিলেন, “চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।” কিন্তু সেই আশ্বাস আর ভালোবাসার পথ আটকে দিল নৃশংস এক হত্যাকাণ্ড।
মাছুয়াপাড়ার সেই তালাবদ্ধ বাড়িটি থেকে গত ২২ আগস্ট (শনিবার) রাত সাড়ে ১১টার দিকে চারজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মর্মান্তিক এই ঘটনায় আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে আরও প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর বাবা রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), মা প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) এবং তাঁর ছোট ভাই পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)। গত ২০ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) মধ্যরাতের পর থেকেই এই পরিবারের সঙ্গে তাঁদের স্বজন বা পরিচিতদের সমস্ত যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সেই বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামের দুই যুবক পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ দিয়ে উঠে মাদক সেবন করছিল। নিষিদ্ধ ইয়াবা সেবনে বাধা দিয়েছিলেন গৃহকর্তা গণপতি চক্রবর্তী। সেই ক্ষোভ থেকেই তাঁরা বাড়িতে ঢুকে পড়েন এবং গামছা পেঁচিয়ে একে একে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন শিক্ষক গণপতি, তাঁর স্ত্রী, তরুণী মেয়ে আগামী ও ছোট ছেলে প্রিয়মকে। নারকীয় এই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর অপরাধীরা বাড়িটিতে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে পালিয়ে যায়।
পরবর্তীতে ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে উপস্থিত হয়ে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁরা আদালতের নির্দেশে কারাগারে চিকিৎসাধীন ও বিচার প্রক্রিয়ার অধীনে রয়েছেন। তবে এই বিচারের প্রক্রিয়ার মাঝেও একটি পরিবারের হঠাৎ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এবং একটি না পৌঁছানো পার্সেল স্থানীয় বাসিন্দা ও শুভানুধ্যায়ীদের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।


