প্রিয় তারকার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ভক্তদের পাগলামির গল্প নতুন কিছু নয়। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন প্রিয় শিল্পীর বাড়ির সামনে, আবার কেউ অটোগ্রাফের আশায় ছুটে যান এক শহর থেকে অন্য শহরে। তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহের তরুণ গণেশ শেখ যা করছেন, তা সত্যি বিরল। কেবল একনজর দেখা ও একটি ছবি তোলার ইচ্ছা বুকে চেপে সাইকেল নিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছেন তিনি। গন্তব্য—জনপ্রিয় গায়ক অরিজিৎ সিংয়ের মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের বাড়ি।
২২ বছর বয়সী গণেশের বাড়ি মালদহের বামনগোলা থানার জামতলা এলাকায়। এলাকায় ‘বালুরঘাট পাকুয়া’ নামে পরিচিত এই তরুণ পেশায় একজন সাধারণ মানুষ। বাবা বিজয় শেখ ও মা মৌসুমী শেখের সাত সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। সংসারের অভাব-অনটনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো খুব বেশি পাননি, পড়াশোনা থেমে যায় মাত্র চতুর্থ শ্রেণিতেই। তবে প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও অরিজিৎ সিংয়ের গানের প্রতি ভালোবাসা আর গায়ককে দেখার স্বপ্ন তাঁর ছিল আকাশছোঁয়া।
সেই অধরা স্বপ্নকে ছোঁয়ার তাগিদেই এক রবিবার ভোর চারটেয় নিজের সাইকেলটি নিয়ে বাড়ি থেকে একাই বেরিয়ে পড়েন গণেশ। সাইকেলের হ্যান্ডেলে সযত্নে বেঁধে নিয়েছেন ভারতের জাতীয় পতাকা। সামনে ঝোলানো হাতে লেখা একটি বড় পোস্টার, যেখানে ইংরেজিতে লেখা—‘এক সফর, এক স্বপ্ন, এক মুলাকাত—২০০ কিমি সাইকেল যাত্রা। অরিজিৎ সিং স্যারের সঙ্গে দেখা করার জন্য।’ দীর্ঘ যাত্রাপথে সোমবার বেলা ১১টা নাগাদ ফারাক্কার বিডিও দফতরের সামনে পৌঁছান তিনি। ফারাক্কা থেকে জিয়াগঞ্জের সোজা সড়কপথ প্রায় ৮৯ কিলোমিটার হলেও পথ ঘুরে তাঁর মোট যাত্রাপথের দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার।
গণেশ জানান, একদম ছোটবেলা থেকেই তিনি অরিজিৎ সিংয়ের কণ্ঠের ভক্ত। প্রিয় শিল্পীর গান শুনেই কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। তাই দীর্ঘদিনের ইচ্ছা, অন্তত একবার সামনে থেকে ভালোবাসার মানুষকে দেখতে পাওয়া। কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রাপথ মোটেও সহজ ছিল না। ক্রমাগত সাইকেল চালানোর কারণে পায়ে তীব্র ব্যথা, তার ওপর প্রখর রোদের তাপ—সব মিলিয়ে শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছে না। তবুও পেছনের দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। গণেশের কাছে খবর ছিল, অরিজিৎ সিং মঙ্গলবার খুব ভোরে মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। তাই সময় নষ্ট না করে সোমবার রাতের মধ্যেই যেকোনো মূল্যে জিয়াগঞ্জে পৌঁছানোই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
অবশ্য তারকাদের সঙ্গে দেখা করতে গণেশের এমন সাইকেল অভিযানের অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও অদম্য জেদ নিয়ে সাইকেল চালিয়ে তিনি ভারতীয় অলরাউন্ডার ক্রিকেটার হার্দিক পান্ডিয়ার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মনে জোর পেয়েছেন তিনি। জিয়াগঞ্জে গণেশের জন্য তাঁর এক বন্ধুও অপেক্ষা করছেন, যিনি বিশেষ এই সাক্ষাতের জন্য ওড়িশা থেকে পাড়ি দিয়েছেন।
ক্লান্তি আর শারীরিক যন্ত্রণা পেছনে ফেলে একবুক আশা নিয়ে এগিয়ে চলছেন গণেশ। প্রিয় গায়কের কাছে পৌঁছাতে পারবেন কি না বা দেখা মিলবে কি না—সেই সংশয় থাকলেও হাল ছাড়তে নারাজ তিনি। ভক্ত ও শিল্পীর এই মেলবন্ধনের ইচ্ছা ইতিমধ্যেই মালদহ ও মুর্শিদাবাদজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০০ কিলোমিটারের লড়াই শেষে অরিজিতের সঙ্গে একটি ছবি তোলার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।


