খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আর্থিক শৃঙ্খলা আরও জোরদার করতে উৎসাহ বোনাস প্রদানের নীতিমালা কঠোর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে— প্রকৃত নিট মুনাফা ছাড়া কোনো ব্যাংকই কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে না। মুনাফা কাগজে-কলমে দেখিয়ে বা পুঞ্জীভূত আয়ের ওপর ভর করে বোনাস বিতরণ এখন থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
মঙ্গলবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংক বছর শেষে ‘কাগুজে মুনাফা’ দেখিয়ে বোনাস দিয়েছে, যা আর্থিক নিয়ম-শৃঙ্খলার পরিপন্থী। ফলে বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে প্রকৃত আয়–ব্যয়ের ভিত্তিতে অর্জিত নিট মুনাফাকেই এখন থেকে বিবেচনায় নিতে হবে।
এছাড়া প্রথমবারের মতো স্পষ্ট করা হয়েছে—
পুঞ্জীভূত মুনাফা (Retained Earnings) থেকে কোনো ধরনের উৎসাহ বোনাস দেওয়া যাবে না।
নতুন নির্দেশনায় বোনাস বিতরণের আগে ব্যাংকগুলোকে যেসব কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে, তা নিচের টেবিলে দেওয়া হলো—
| শর্ত | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| নিট মুনাফা না হলে বোনাস নয় | প্রকৃত আয়–ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে নিশ্চিত নিট মুনাফা থাকতে হবে। |
| মূলধন ঘাটতি থাকলে নিষিদ্ধ | রেগুলেটরি ক্যাপিটাল ঘাটতি থাকলে কোনো অবস্থায় বোনাস দেওয়া যাবে না। |
| নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে ঘাটতি হলে নিষেধাজ্ঞা | নিরাপত্তা সঞ্চিতি অসম্পূর্ণ থাকলে বোনাস সম্পূর্ণ বন্ধ। |
| বিলম্বিত ছাড় সুবিধা নিলে বোনাস নয় | সঞ্চিতি বিলম্ব সুবিধা নেওয়া বছরের জন্য বোনাস অনুমোদিত নয়। |
| কৃত্রিম বা কাগুজে মুনাফা প্রদর্শন নিষিদ্ধ | হিসাব-চালাচালি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। |
| খারাপ ঋণ আদায়ে অগ্রগতি জরুরি | শ্রেণিকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান উন্নতি থাকতে হবে। |
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, শুধুমাত্র মুনাফা দেখলেই হবে না— ব্যাংকের সার্বিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনও বোনাস বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে—
খেলাপি ঋণ কমানো
ঋণ পুনরুদ্ধারে অর্জন
মূলধন-পর্যাপ্ততা বজায় রাখা
সম্পদের গুণগত মান উন্নয়ন
কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালীকরণ
অর্থাৎ, শুধু হিসাবের খাতায় লাভ দেখিয়ে বোনাস আদায় আর সম্ভব নয়।
সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে ‘২০২৫ সালের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ইনসেনটিভ বোনাস নির্দেশিকা’ অনুসরণ করতে হবে। সেখানে তাদের জন্য আরও কাঠামোবদ্ধ, কঠোর ও আলাদা মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে এ বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যাংকই উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে না। কারণ—
বেশ কিছু ব্যাংকের রেগুলেটরি মূলধন ঘাটতি রয়েছে
বহু ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতি অসম্পূর্ণ
বছর শেষে কৃত্রিম মুনাফা দেখানোর প্রবণতা ছিল
কিছু ব্যাংক ছাড় সুবিধা নিয়ে প্রকৃত মুনাফা লুকিয়ে রেখেছে
এখন এসব কৌশলের সুযোগ আর থাকবে না।
তাদের মতে, এই নীতি ব্যাংকিং খাতকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করবে। লাভজনক, সুশাসিত ও স্বচ্ছ ব্যাংকগুলোই কেবল কর্মীদের উৎসাহ দিতে পারবে। দুর্বল ব্যাংকগুলো বাধ্য হবে নিজেদের আর্থিক ভিত্তি শক্ত করতে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কঠোর করতে।
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে—
অর্থাৎ, সত্যিকারের লাভবান, স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল ব্যাংকই কেবল উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে; অন্যদের আগে নিজেদের আর্থিক ভিত্তি মজবুত করতে হবে।