খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ জুলাই ২০২৫
সীমান্তবর্তী একটি প্রাচীন শিবমন্দির ঘিরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সম্পর্ক। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) দুই দেশের মধ্যে নতুন করে শুরু হয় ভয়াবহ সংঘর্ষ, যা এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র বলে মনে করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন এবং আহত হয়েছেন আরও অনেকে। নিরাপত্তাজনিত শঙ্কায় দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে ঘরবাড়ি ছেড়েছেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। এতে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও চরম উত্তেজনার মুখে পড়েছে।
মাত্র ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার আয়তনের একটি সীমান্ত অঞ্চল ঘিরেই এই দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা। ২০০৮ সালে স্পষ্টভাবে এই এলাকা ‘বিরোধপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। মূলত দুটি প্রাচীন মন্দির—প্রিয়াহ ভিহিয়ার ও তা মন থম—ঘিরে এই বিরোধ। এগুলো ১১শ শতকের খেমার সাম্রাজ্যের হিন্দু মন্দির এবং বর্তমানে ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য।
২০০৮ সালে কম্বোডিয়া প্রিয়াহ ভিহিয়ার মন্দিরকে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করে এবং তা গৃহীত হলে থাইল্যান্ড তীব্র প্রতিবাদ জানায়। বিষয়টি দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতাও ডেকে আনে। ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি এই মন্দিরদ্বয় দুই দেশের জাতীয় গর্ব ও ভূরাজনৈতিক দাবির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়ার এই সীমান্ত বিরোধের ইতিহাস শতাব্দীপ্রাচীন। ১৪শ থেকে ১৫শ শতক পর্যন্ত খেমার সাম্রাজ্য আধুনিক থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার অনেক অংশ শাসন করত। সাম্রাজ্য পতনের পর থাই ও ভিয়েতনামি রাজ্যগুলো খেমার ভূখণ্ড দখল করতে থাকে।
১৮৬৩ সালে ফ্রান্স কম্বোডিয়াকে উপনিবেশ বানানোর পর একাধিক চুক্তির মাধ্যমে থাইল্যান্ডকে কিছু ভূখণ্ড ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ১৯০৭ সালে ফরাসিদের তৈরি মানচিত্রে প্রিয়াহ ভিহিয়ার মন্দিরকে কম্বোডিয়ার অংশ হিসেবে দেখানো হয়। তৎকালীন শ্যাম (বর্তমান থাইল্যান্ড) শুরুতে এ মানচিত্রে সম্মতি দিলেও পরে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। থাইদের দাবি, তারা ভেবেছিল প্রাকৃতিক জলবিভাজিকা ধরে সীমান্ত নির্ধারিত হয়েছে, কিন্তু মানচিত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি।
এই বিরোধ গড়ায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসেজে)-এ। ১৯৬২ সালে আদালত প্রিয়াহ ভিহিয়ার মন্দির কম্বোডিয়ার অন্তর্ভুক্ত বলে রায় দেন এবং থাইল্যান্ডকে সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। সেইসঙ্গে ১৯৫৪ সালের পর মন্দির এলাকা থেকে নেওয়া প্রত্ন নিদর্শন ফিরিয়ে দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে বিরোধ এখানেই থেমে থাকেনি। ২০১৩ সালে আইসিজে পুনরায় রায় ব্যাখ্যা করে জানায়, শুধু মন্দির নয়, মন্দিরসংলগ্ন এলাকাও কম্বোডিয়ার অন্তর্ভুক্ত। আদালত তখন আবারও থাইল্যান্ডকে সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেও দেশটি তা মেনে নেয়নি।
চলমান এই সংঘাত দুই দেশের মানুষের জীবনে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। ঐতিহাসিক মানচিত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সংঘর্ষ এই বিরোধকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খবরওয়ালা/শরিফ