অব্যাহত লোকসান, করপোরেট সিন্ডিকেট এবং বাজার অস্থিরতার চাপে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের ডিম-মুরগির খামারগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে দেশে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার খামার থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৫০ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। শুধু গত ছয় মাসেই প্রায় ১০ হাজার প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে গেছে।
খামারিরা বলছেন, করপোরেট কোম্পানিগুলোর সিন্ডিকেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে না পেরে তারা ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে পড়েছেন। একপর্যায়ে তারা খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিপিএ’র সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার জানান, প্রান্তিক খামারিরা রমজান ও ঈদ মৌসুমেও ভয়াবহ লোকসানের মধ্যে প্রতিদিন ২০ লাখ কেজি মুরগি উৎপাদন করেছেন। এখনো প্রতি কেজি ব্রয়লারে ৩০-৪০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। প্রতিটি ডিমে লোকসান হচ্ছে ২ টাকা করে।
বিপিএ সভাপতি কন্ট্রাক্ট ফার্মিংকে প্রান্তিক খামারিদের দুর্দশার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে দাম কমিয়ে ক্ষুদ্র খামারিদের বিপদে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা বাধ্য হয়ে করপোরেট কোম্পানির নির্ভরশীল ফার্মিংয়ে যুক্ত হন। এতে ওই কোম্পানিগুলো ফিড, ওষুধ, বাচ্চা সরবরাহ করে এবং পণ্যের দামও নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা নষ্ট হচ্ছে।
রাজবাড়ীর খামারি টিআইএম জাহিদুর রহিম বলেন, “২০০৭ সাল থেকে খামার চালাচ্ছি। ব্যাংক ঋণ, খাবার, ওষুধ—সব খরচ দিতে দিতে আমরা ঋণের পাহাড়ে চাপা পড়েছি। লাভের সময় যা পাই, তা ঋণ মেটাতে গিয়েই শেষ হয়ে যায়। আরেক দফা দাম কমলেই আবার লোকসানে পড়ে যাই।”
নরসিংদীর খামারি বিলকিস আহমেদ বলেন, “দুই হাজার মুরগির জন্য মাসে এক লাখ টাকা খরচ হয়, অথচ বিক্রির সময় দাম মেলে না। আমরা তো সব সময়ই ঘাটতিতে থাকি। সরকার যেন অন্তত ভর্তুকির ব্যবস্থা করে ক্ষুদ্র খামারিদের টিকিয়ে রাখে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ফিড ও ওষুধের দাম কমলেও দেশে তা কমছে না। এতে প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কমছে লাভ। এই অবস্থায় তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। অথচ দেশে প্রতিদিন ৪ কোটি ডিম ও ৫ হাজার ২০০ টন মাংসের চাহিদার ৮০ শতাংশই পূরণ করেন এই প্রান্তিক খামারিরা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, “আমরা সবসময় ভোক্তার কথা ভাবি, উৎপাদককে অবহেলা করি। যেখানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ে ১০ টাকা, সেখানে বিক্রি হচ্ছে ৮ টাকায়। এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে খামারিরা আর টিকতে পারবে না। কয়েক বছর পর আর কেউ এই খাতে আসতেও চাইবে না।”
খবরওয়ালা/এমএজেড



