ফরিদপুর সদর উপজেলায় বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর ইউসুফ ফকির (৪৫) নামে এক পেঁয়াজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, তাকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণের পর ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। দাবিকৃত মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে অপহরণকারীরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ পাটখেতে ফেলে রেখে যায়।
শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল সাতটার দিকে সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের রোকমান খার ডাঙ্গী গ্রামের একটি পাটখেত থেকে তার মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহত ইউসুফ ফকির ওই গ্রামের সেকেন ফকিরের ছেলে। তিনি পেশায় একজন পেঁয়াজের পাইকারি ব্যবসায়ী ছিলেন এবং মৃত্যুকালে দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার ও স্থানীয় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিখোঁজ ও মুক্তিপণ দাবি
নিহতের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউসুফ ফকিরের শরীর কিছুটা অসুস্থ বোধ হওয়ায় তিনি মমিনখার হাট বাজারের একটি ফার্মেসিতে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। বাজারের কাজ শেষ করে সন্ধ্যার দিকে তিনি একটি ইজিবাইকে করে নিজ বাড়ির সামনে এসে নামেন। এরপর থেকেই মূলত তিনি নিখোঁজ হন।
ইউসুফের শ্বশুর আজিজ খান জানান, ইজিবাইক চালক ইউসুফকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা ইউসুফের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন কেটে দেন এবং রাত নয়টার পর থেকে তার মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায়। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো সন্ধান না মেলায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ইউসুফের ভাতিজা সাইফুল ফকির ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
জিডি করার পরদিন, অর্থাৎ শুক্রবার বিকেলে ইউসুফের নিজস্ব মুঠোফোন নম্বর থেকে তার মেয়ের নম্বরে একটি কল আসে। অপর প্রান্ত থেকে অজ্ঞাত পরিচয় অপহরণকারীরা ইউসুফকে জিম্মি করার কথা জানায় এবং তাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেতে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
মরদেহ উদ্ধার ও পুলিশের বক্তব্য
চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আলী মদ্দীন ফকির জানান, শনিবার ভোর ছয়টার দিকে কয়েকজন কৃষক জমিতে পাট কাটতে যান। এ সময় ইউসুফের বাড়ি থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে একটি পাটখেতের ভেতর তার হাত-পা বাঁধা মরদেহ দেখতে পেয়ে তারা চিৎকার করেন। পরে স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা এসে লাশটি শনাক্ত করেন এবং পুলিশে খবর দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মরদেহের মুখ দিয়ে বিষাক্ত কীটনাশকের প্রতিক্রিয়া বা ফেনা বের হচ্ছিল এবং লাশের ঠিক পাশেই একটি কীটনাশকের বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে অপরাধীরা এই চক্রান্ত করে থাকতে পারে।
খবর পেয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহটি উদ্ধার করে। সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
থানা প্রশাসনের বক্তব্য: ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুল হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, “আমরা মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছি। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মুক্তিপণের বিষয়টির পাশাপাশি অন্য কোনো শত্রুতা বা পারিবারিক বিরোধ রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং এর সাথে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। আশা করছি খুব দ্রুতই রহস্য জট খুলবে।”



