আর্জেন্টিনার ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসির বাবা এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত এজেন্ট খোর্খে মেসি আর নেই। রোজারিওর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি জটিল শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় সময় রাত ১০টার দিকে তিনি মারা যান। খোর্খে মেসির মৃত্যুতে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, বিভিন্ন ক্লাব এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মাঝে গভীর শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল মেসি আজ যে অনন্য উচ্চতায় আসীন, তার বুনিয়াদ তৈরি হয়েছিল বাবা খোর্খে মেসির হাত ধরেই। কেবল একজন পিতা হিসেবেই নন, পেশাদার ফুটবলে মেসির মাঠের বাইরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, চুক্তি পরিচালনা এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি নিজেই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। বলা যায়, ফুটবল মাঠের জাদু যদি মেসির পা থেকে এসে থাকে, তবে মাঠের বাইরে তার প্রতিটি পদক্ষেপ সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করেছেন তার বাবা।
লিওনেল মেসির শৈশবের গল্পটি কখনোই সহজ ছিল না। খুব ছোটবেলায় যখন মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোনজনিত জটিলতা ধরা পড়ে, তখন চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ছাড়া তার স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি সম্ভব নয়। কিন্তু আর্জেন্টিনার সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল হরমোন থেরাপির খরচ জোগানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। সেই দুঃসময়ে ভেঙে পড়েননি খোর্খে মেসি। ছেলের অসীম ফুটবল প্রতিভার ওপর তার পূর্ণ আস্থা ছিল। তিনি স্থানীয় বিভিন্ন ক্লাব ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন সহায়তার জন্য।
অবশেষে খোর্খে মেসির অদম্য চেষ্টার ফলেই সাড়া দেয় স্প্যানিশ ফুটবল জায়ান্ট বার্সেলোনা। বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ মেসির চিকিৎসার সব খরচ বহনে রাজি হলে পুরো পরিবারকে নিয়ে স্পেনে পাড়ি জমান খোর্খে। স্বদেশ ছেড়ে অচেনা ইউরোপীয় সংস্কৃতি এবং নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়া মোটেই সহজ কাজ ছিল না। সেই কঠিন দিনগুলোতে তিনি ছায়ার মতো ছেলেকে মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছেন এবং বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’য় ছেলের ভর্তি সুনিশ্চিত করেছিলেন।
পরবর্তীকালে তরুণ মেসি যখন ক্লাবের মূল দলে জায়গা করে নেন, তখন থেকে খোর্খে মেসি আনুষ্ঠানিকভাবে তার ম্যানেজমেন্ট ও এজেন্টের দায়িত্ব নেন। দীর্ঘ দুই দশকের ক্লাব ক্যারিয়ারে বার্সেলোনার একের পর এক ট্রফি ও ব্যালন ডি’অর জয়, করসংক্রান্ত জটিলতা কিংবা ক্লাব ছাড়ার মতো কঠিন পরিস্থিতি—সবকিছুতেই শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন খোর্খে। বার্সেলোনা থেকে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামিতে স্থানান্তরের সমস্ত জটিল অর্থনৈতিক আলোচনা তিনি সফলভাবে শেষ করেন।
মেসির আটটি ব্যালন ডি’অর অর্জন এবং ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মহাকাব্যিক শিরোপা জয়ের নেপথ্যে খোর্খে মেসির নিরলস পরিশ্রম ও দিকনির্দেশনা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ফুটবল তারকা হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে নামী বিজ্ঞাপন সংস্থা ও ক্লাবের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সময় সবসময় মেসির সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ ছিলেন তার বাবা। খোর্খে মেসির এই চিরবিদায় লিওনেল মেসির ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি তার পেশাদার যাত্রাতেও এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল।
মন্তব্য