খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই মার্চ ২০২৬, ৬:৭ এএম
ইসলামী চিন্তাধারা ও সমকালীন মুসলিম সমাজতত্ত্বের বিশ্বে একসময় অত্যন্ত প্রভাবশালী নাম ছিলেন তারিক রমাদান। তবে দীর্ঘ কয়েক বছরের আইনি লড়াই ও বিতর্কের পর অবশেষে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের একটি আদালতে তিন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে তাঁর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। সোমবার (২ মার্চ) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই হাই-প্রোফাইল মামলার রায় যদি তাঁর বিপক্ষে যায়, তবে ৬৩ বছর বয়সী এই গবেষকের সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
সুইস বংশোদ্ভূত তারিক রমাদান মুসলিম বিশ্বের একজন প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকালীন ইসলামী অধ্যয়নের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর বাইরেও তিনি যুক্তরাজ্য সরকারের ইসলাম ও সমাজবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর লেখনী ও বক্তৃতা একসময় ইউরোপীয় মুসলিম তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তবে ২০১৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের প্রথম অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায় এবং ২০২১ সালে তিনি আগাম অবসরে যেতে বাধ্য হন।
ফরাসি প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ফ্রান্সে অবস্থানকালে তারিক রমাদান তিন নারীকে বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্তা করেন। এই মামলাটিকে ফ্রান্সে ‘হ্যাশট্যাগ মি-টু’ (#MeToo) আন্দোলনের একটি বড় বিজয় ও আলোচিত অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিচে অভিযোগকারী নারীদের বর্ণনা ও ঘটনার সংক্ষিপ্ত তথ্য দেওয়া হলো:
| অভিযোগকারীর নাম/ছদ্মনাম | ঘটনার সময়কাল | স্থানের বিবরণ | মূল অভিযোগ |
| হেনদা আয়াড়ি (৪১) | ২০১২ সালের বসন্ত | প্যারিসের একটি হোটেল | ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন |
| ক্রিস্টেল (ছদ্মনাম) | ২০০৯ সালের অক্টোবর | লিয়ন শহরের একটি হোটেল | ধর্ষণ ও অত্যন্ত সহিংস শারীরিক আক্রমণ |
| তৃতীয় নারী (অপ্রকাশিত) | ২০১৬ সাল | ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ এলাকা | বলপূর্বক ধর্ষণ ও যৌন নিপিড়ন |
তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে তারিক রমাদান অভিযোগকারীদের সাথে কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্কের কথা সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন। তবে ২০১৮ সালে তদন্তকারী বিচারকদের সামনে তিনি তাঁর পূর্ববর্তী জবানবন্দি পরিবর্তন করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, আয়াড়ি এবং ক্রিস্টেলের সঙ্গে তাঁর যৌন সম্পর্ক ছিল, তবে তা ছিল সম্পূর্ণ ‘পারস্পরিক সম্মতিতে’। রমাদানের আইনজীবীদের দাবি, এটি কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয় বরং একটি ষড়যন্ত্র। অন্যদিকে, অভিযোগকারীদের আইনজীবীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এটি কোনো রাজনৈতিক লড়াই বা ধর্মীয় প্রতিহিংসা নয়, বরং নিছক একটি ধর্ষণের বিচার।
তারিক রমাদানের আইনজীবীরা দাবি করেছেন যে, তিনি একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত। এই অবস্থায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সশরীরে উপস্থিত থাকা তাঁর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বেও ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের একটি আপিল আদালত ২০০৮ সালের একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে তাঁকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। যদিও রমাদানের আইনি দল এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে বিষয়টি ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
প্যারিসের এই বিচার প্রক্রিয়াটি কেবল রমাদানের ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের জন্যই নয়, বরং ইউরোপে নারী অধিকার এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার প্রশ্নে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।
মন্তব্য