ভারত ও কানাডার ঐতিহাসিক পারমাণবিক ও কৌশলগত চুক্তি

দীর্ঘদিন ধরে চলমান তীব্র কূটনৈতিক শীতলতা কাটিয়ে অবশেষে সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে ভারত ও কানাডা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর দুই দেশ ১০ বছর মেয়াদি একটি মাইলফলক পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ চুক্তিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই বৈঠকে অংশ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এই ঐতিহাসিক সমঝোতার বিস্তারিত জানা গেছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি খাতে ইউরেনিয়াম সরবরাহের চুক্তিটিকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই চুক্তির ফলে ভারত আগামী এক দশকের জন্য তার ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য জ্বালানির নিশ্চয়তা পেল। এছাড়া দুই দেশ যৌথভাবে ক্ষুদ্র মডুলার রিয়্যাক্টর (SMR) এবং উন্নত রিয়্যাক্টর প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মোদী উল্লেখ করেন যে, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ভারত ও কানাডা একে অপরের ‘স্বাভাবিক অংশীদার’। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সুপারকম্পিউটিংয়ের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতেও এখন থেকে দুই দেশ নিবিড়ভাবে কাজ করবে।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার কথা উল্লেখ করে বলেন, কানাডা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় অন্যতম প্রধান সহযোগী হতে সক্ষম। দুই নেতা বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (CEPA) চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। বর্তমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রাও স্থির করা হয়েছে।

নিচে বৈঠকে আলোচিত প্রধান সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহ একটি তালিকার মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

সহযোগিতার ক্ষেত্র চুক্তির মেয়াদ ও লক্ষ্য মূল গুরুত্ব
পারমাণবিক জ্বালানি ১০ বছর দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহ নিশ্চিত করা।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন দীর্ঘমেয়াদি এআই, সেমিকন্ডাক্টর ও সুপারকম্পিউটিং।
বাণিজ্য (CEPA) ২০২৬ (লক্ষ্যমাত্রা) ৫০ বিলিয়ন ডলারে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উন্নীতকরণ।
জ্বালানি কৌশল কৌশলগত অংশীদারত্ব ক্ষুদ্র মডুলার রিয়্যাক্টর (SMR) উন্নয়ন।
অন্যান্য ক্ষেত্র সমঝোতা স্মারক মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা খাত।

বৈরী সম্পর্কের বরফ গলছে

২০২৩ সালে কানাডার মাটিতে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নজিরবিহীন তিক্ততা তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর তোলা অভিযোগ ভারত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে উভয় দেশ কূটনীতিক বহিষ্কার এবং ভিসা সেবা স্থগিতের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে মার্ক কার্নি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমান কানাডীয় সরকার জানিয়েছে যে, কানাডার অভ্যন্তরীণ কোনো হুমকির সঙ্গে ভারতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ এখন আর নেই, যা এই সমঝোতার পথ সুগম করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির প্রভাব মোকাবিলা এবং বাণিজ্যের বাজার বহুমুখীকরণের তাগিদেই ভারত ও কানাডা একে অপরের কাছাকাছি এসেছে। দিল্লির বৈঠক শেষে মার্ক কার্নির অস্ট্রেলিয়া ও জাপান সফরের কথা রয়েছে, যা কানাডার ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।