খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যকার হাইভোল্টেজ লড়াইকে কেন্দ্র করে মাঠের উত্তেজনার পারদ যেমন চড়ছে, তেমনই মাঠের বাইরেও শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বাকযুদ্ধ। এই বিতর্কের আগুনে এবার ঘি ঢাললেন স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়। ফ্রান্স জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের জাতিগত পটভূমি নিয়ে তাঁর একটি মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত স্পেনের সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মারিয়ানো রাহয় স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম-এ প্রকাশিত নিজের একটি নিয়মিত কলাম বা নিবন্ধে ফ্রান্স ফুটবল দল নিয়ে এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি তাঁর নিবন্ধে লেখেন, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষসারিতে থাকা ফ্রান্সের বর্তমান দলটিতে বিশ্বমানের বহু খেলোয়াড় রয়েছে। তবে এর পরপরই তিনি এক অদ্ভুত দাবি করে বসেন। তাঁর মতে, ফ্রান্সের এই দলটিতে আসলে ‘কোনো ফরাসি খেলোয়াড় নেই’, যদিও তারা দল হিসেবে দুর্দান্ত খেলছে। মূলত ফরাসি স্কোয়াডের অধিকাংশ খেলোয়াড় আফ্রিকান বা অন্যান্য অভিবাসী বংশোদ্ভূত হওয়ায় তিনি এমন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
রাহয়ের এই কলামটি প্রকাশের পরপরই ফ্রান্স জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা তাঁর এই বক্তব্যকে চরম বর্ণবাদী, সংকীর্ণ এবং সমাজে বিভাজন তৈরির অপচেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এই বিষয়ে রোববার ফরাসি সংবাদমাধ্যম-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তিনি কড়া ভাষায় বলেন, স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফ্রান্স এমন একটি উদার রাষ্ট্র যেখানে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যই হলো আসল শক্তি। বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও পটভূমির মানুষ এখানে সমান সুযোগ পেয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার অধিকার রাখে। ফরাসি ফুটবলাররা ফরাসি নাগরিক হিসেবেই দেশের জার্সিতে খেলছেন এবং বিশ্বমঞ্চে দেশের গৌরব বয়ে আনছেন।
বর্ণবাদের গন্ধ থাকা এই বক্তব্যের সমালোচনা কেবল ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, স্বয়ং স্পেনের বর্তমান রাজনৈতিক মহলেও এটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্পেনের বর্তমান সরকারের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি আক্রমণ করে বলেন, এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য কোনো পরিপক্ক রাজনীতিকের মুখ থেকে আশা করা যায় না। রাহয় নিজেকে সবসময় একজন মধ্যপন্থী রক্ষণশীল নেতা হিসেবে দাবি করলেও এই বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁর আসল মানসিকতা প্রকাশ পেয়ে গেছে।
বিতর্কটি আরও বড় আকার ধারণ করলে এতে যোগ দেন স্পেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক পোস্টে তিনি মারিয়ানো রাহয়ের নাম উল্লেখ না করে তাঁর তীব্র সমালোচনা করেন। সানচেজ লেখেন, ২১ শতকে এসেও পৃথিবীতে এখনও এমন কিছু মানুষ রয়ে গেছেন যারা কোনো স্বাধীন দেশের নাগরিকত্বকে মানুষের বংশের পদবি, জন্মস্থান কিংবা গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করার চেষ্টা করেন। অথচ একজন মানুষের প্রকৃত জাতীয় পরিচয় নির্ধারিত হওয়া উচিত নিজ দেশের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা, ভালোবাসা এবং সর্বোপরি দেশের জন্য তাঁর অবদানের ভিত্তিতে। স্পেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট ভাষায় ‘বিদেশিবিদ্বেষী’ ও আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে বেমানান বলে অভিহিত করেছেন। সব মিলিয়ে সেমিফাইনালের মহারণের আগেই দুই দেশের রাজনৈতিক টেবিল এখন উত্তপ্ত।