খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে আস্থা ও তারল্যসংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। একদিকে কিছু ব্যাংকে আমানত উত্তোলনে জটিলতা, মেয়াদপূর্তির পর এফডিআর ও ডিপিএসের অর্থ ফেরতে বিলম্ব, অন্যদিকে গ্রাহকদের অর্থ পুনরায় বিনিয়োগে বাধ্য হওয়ার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে। এই বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ করনৈতিক প্রশ্ন—যে আয় একজন করদাতা বাস্তবে হাতে পাননি, সেই আয়ের ওপর কর আরোপ কতটা ন্যায়সংগত?
বিষয়টি শুধু কর আইনের ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, করদাতার সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দর্শন। একটি আধুনিক করব্যবস্থার মূলনীতি হলো, কর আরোপ করতে হবে করদাতার প্রকৃত অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু যদি কোনো আয় কেবল হিসাবের খাতায় সৃষ্টি হয়, অথচ করদাতা সেই অর্থ ব্যবহার বা ভোগ করতে না পারেন, তাহলে সেই আয়ের ওপর তাৎক্ষণিক কর আরোপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ২০২০ সালে একটি ডাবল বেনিফিট এফডিআর স্কিমে ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্কিমটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁর প্রাপ্য দাঁড়াল ১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫০ লাখ টাকা মূলধন এবং ৫০ লাখ টাকা সুদ। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে ৫ লাখ টাকা উৎসে কর কেটে নিল। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকের তারল্যসংকটের কারণে গ্রাহক যদি সেই অর্থ উত্তোলন করতে না পারেন, তাহলে পরিস্থিতি দাঁড়ায় ভিন্ন।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মেয়াদপূর্তির পর গ্রাহককে নগদ অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে পুরো অর্থ আবার নতুন করে আমানত হিসেবে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রাহক অনেক সময় বাধ্য হয়েই এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে কাগজে-কলমে তাঁর ৫০ লাখ টাকা সুদ আয় হিসেবে দেখালেও বাস্তবে তিনি সেই অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
এ অবস্থায় আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় উৎসে কর্তিত করের বাইরে অতিরিক্ত কর পরিশোধের প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ একজন আমানতকারী একদিকে নিজের অর্থ ফেরত না পাওয়ার সমস্যায় পড়ছেন, অন্যদিকে এমন আয়ের জন্য করের দায় বহন করছেন, যা এখনো তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই।
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত থেকে পাওয়া সুদ বা মুনাফা ‘আর্থিক পরিসম্পদ থেকে আয়’ হিসেবে বিবেচিত হয়। আইনের ৬২ ধারায় এ ধরনের আয়ের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। একই আইনের ৬৩ ধারায় করযোগ্য আয়ের সময় নির্ধারণে ‘প্রাপ্ত বা অর্জিত—যেটি আগে’ নীতি অনুসরণ করা হয়। এর ফলে কোনো ব্যাংক সুদের হিসাব সম্পন্ন করে গ্রাহকের হিসাবে দায় সৃষ্টি করলে সেটি অনেক ক্ষেত্রে অর্জিত আয় হিসেবে বিবেচিত হয়, যদিও গ্রাহক অর্থ হাতে না-ও পেতে পারেন।
অন্যদিকে, আইনের ১০২ ধারায় সুদ গ্রাহকের হিসাবে জমা হওয়া বা প্রকৃত অর্থ পরিশোধের সময় উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। পরে ১৭৩ ধারার অধীনে রিটার্ন দাখিলের সময় মোট করদায় নির্ধারণ করে উৎসে কর্তিত কর সমন্বয় করা হয়। ফলে বর্তমান আইনি কাঠামোয় এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে একজন করদাতাকে নগদ অর্থ না পেলেও কর পরিশোধ করতে হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এই বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, মূলধন ঘাটতি, তারল্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সুশাসনের ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার কয়েক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯ শতাংশ, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই হার আরও বেড়ে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে আমানতকারীদের সুরক্ষা নিয়ে সরকারও নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠন, বিকল্প ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ আইন প্রণয়ন পর্যায়েই স্বীকার করা হয়েছে যে বিশেষ পরিস্থিতিতে আমানতকারীরা অর্থপ্রাপ্তির সমস্যায় পড়তে পারেন।
কিন্তু কর আইনে এই বাস্তবতার প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে একটি অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। ব্যাংক যদি অর্থ পরিশোধ করতে না পারে, তাহলে সেই অর্থ থেকে সৃষ্ট সুদকে কতটা বাস্তব আয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট সমাধান প্রয়োজন।
করনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কর আদায় করা। শুধু হিসাবের খাতায় কোনো অর্থ যুক্ত হলেই তা সবসময় করদাতার প্রকৃত সক্ষমতা বাড়ায় না। বিশেষ করে যখন অর্থ আটকে থাকার কারণ করদাতার নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়, বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা।
এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয় সংস্কৃতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। একজন নাগরিক যদি দেখেন, ব্যাংকে রাখা অর্থ প্রয়োজনের সময় পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু সেই অর্থ থেকে হিসাব করা আয়ের ওপর কর দিতে হচ্ছে, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বিষয়ে নীতিগত স্পষ্টতা প্রয়োজন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চাইলে ব্যাখ্যামূলক নির্দেশনার মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারে। পাশাপাশি আয়কর আইনেও বিশেষ বিধান যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে, যাতে ব্যাংকের তারল্যসংকট, নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধ বা আদালতের আদেশের কারণে আটকে থাকা সুদের করযোগ্যতা প্রকৃত অর্থপ্রাপ্তির সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
বর্তমান ব্যবস্থায় পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে—
| বিষয় | সম্ভাব্য নীতিগত উদ্যোগ |
|---|---|
| অনাদায়ি সুদের করযোগ্যতা | প্রকৃত অর্থপ্রাপ্তির আগে কর স্থগিতের ব্যবস্থা |
| আয়কর আইন, ২০২৩ | বিশেষ পরিস্থিতির জন্য নতুন বিধান সংযোজন |
| উৎসে কর কর্তন | প্রকৃত অর্থ পরিশোধের সময় কর কর্তনের ব্যবস্থা |
| অতিরিক্ত কর পরিশোধ | কর স্থগিত বা কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ |
| ব্যাংক তারল্যসংকট | ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীর জন্য বিশেষ বিবেচনা |
| করদাতার সুরক্ষা | বাস্তব আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কর নির্ধারণ |
| ব্যাংকিং আস্থা | সঞ্চয়কারীদের আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ |
| নিয়ন্ত্রক সমন্বয় | বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের সমন্বিত নীতি |
| কর প্রশাসন | অনাদায়ি আয়ের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা |
| দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার | কর ও ব্যাংকিং নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা |
রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রয়োজন, তবে সেই রাজস্ব এমন আয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, যা করদাতা এখনো বাস্তবে ভোগ করতে পারেননি। একটি কার্যকর করব্যবস্থা শুধু আইন মেনে চলার বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচার, বাস্তবতা এবং জনআস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ যখন ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে, তখন করনীতিকেও সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আমানতকারীর অধিকার এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব স্বার্থ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হতে পারে ভবিষ্যতের টেকসই করব্যবস্থার ভিত্তি।