খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন মাঠের খেলোয়াড়দের পাশাপাশি লাইমলাইটে চলে এসেছেন এক রেফারি। ফুটবল মাঠের বাঁশি হাতে কঠোর নিয়মকানুন বজায় রাখা এই মানুষটির পর্দার পেছনের পরিচয় জানলে যে কেউ চমকে উঠবেন। তিনি কেবল একজন দক্ষ রেফারিই নন, ফুটবলের সবুজ ঘাস ছেড়ে ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডেও তাঁর সমান বিচরণ। এল সালভাদর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল সায়েন্সে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন তিনি। রসায়নের সেই অধ্যাপক ইভান বার্তন এবার ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের দায়িত্ব সামলাবেন। ডালাসে আগামীকাল রাতে ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যকার প্রথম সেমিফাইনাল ম্যাচটি পরিচালনার দায়িত্ব পড়েছে তাঁর ওপর।
সাধারণ প্রথা অনুযায়ী, বড় টুর্নামেন্টের ম্যাচের আগের দিন রেফারিদের নাম চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হয়। বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালের অফিশিয়ালদের নামও এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। সেই তালিকায় প্রধান রেফারি হিসেবে জ্বলজ্বল করছে ৩৫ বছর বয়সী ইভান বার্তনের নাম। এই দায়িত্ব পাওয়ার মাধ্যমে এক অনন্য ইতিহাসও গড়লেন তিনি। ছেলেদের বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া প্রথম এল সালভাদরিয়ান রেফারি এখন এই রসায়নের শিক্ষক। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে বার্তনের সহকারী হিসেবে থাকবেন তাঁরই দুই স্বদেশি দাভিদ মোরান ও আন্তোনিও পুপিরো। এ ছাড়া চতুর্থ অফিশিয়াল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সুইডেনের গ্লেন নিবার্গ এবং রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে থাকবেন আরেক সুইডিশ মাহবোদ বেইগি।
বার্তনের পুরো নাম ইভান আর্কিডেস বার্তন সিসনেরোস। ১৯৯১ সালের ২৭ জানুয়ারি মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদরের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সান্তা আনায় তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভীষণ তুখোড় ছিলেন বার্তন। তবে শিক্ষার পাশাপাশি ফুটবলের প্রতিও তাঁর ছিল এক সহজাত ঝোঁক। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সমান্তরালে তিনি রেফারি হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে শুরু করেন। এল সালভাদরের ঘরোয়া ফুটবলে বহু ম্যাচ সফলভাবে পরিচালনা করার পর ২০১৮ সালে তিনি ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির তালিকাভুক্ত হন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে নাম লেখানোর পর গত কয়েক বছরে তাঁর ক্যারিয়ারের গ্রাফ কেবল ওপরের দিকেই উঠেছে। কনকাকাফ গোল্ড কাপ, কনকাকাফ নেশন্স লিগ, অলিম্পিক ফুটবল, কোপা আমেরিকা এমনকি কাতার বিশ্বকাপেও তিনি সফলভাবে তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন। কাতার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বনাম সেনেগালের মধ্যকার শেষ ষোলোর ম্যাচটিতে তাঁর নিখুঁত ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত ফুটবল বোদ্ধাদের প্রশংসা কুড়ায়, যা ফিফার নীতিনির্ধারকদের মনে তাঁর প্রতি গভীর আস্থা তৈরি করে।
সেই আস্থার ধারাবাহিকতাতেই এবারের আসরে সেমিফাইনালসহ মোট চারটি ম্যাচ পরিচালনার বড় দায়িত্ব পেলেন বার্তন। তবে এবারের আসরের গ্রুপ পর্বে প্যারাগুয়ে ও তুরস্কের ম্যাচটিতে তাঁর একটি সিদ্ধান্ত ফুটবল দুনিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই ম্যাচে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার মিগুয়েল আলমিরন তুরস্কের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় মের্ত মুলদুরকে মুখ ঢেকে কিছু একটা বলেছিলেন। মুলদুর সঙ্গে সঙ্গে রেফারির দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বার্তন সময় নষ্ট না করে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) সাহায্য নেন। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে তিনি আলমিরনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। মুখ ঢেকে আপত্তিকর কথা বলায় চলতি বিশ্বকাপে এটিই প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র লাল কার্ড দেখানোর ঘটনা।
মাঠে এমন একজন কঠোর ও আপসহীন রেফারিকে পাশে নিয়ে সেমিফাইনালের মহারণে নামতে হচ্ছে ইউরোপের দুই পরাশক্তিকে। কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা লামিন ইয়ামালদের মতো তারকা ফুটবলাররা মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে রেফারির এই কড়া মেজাজের কথা মাথায় রেখে নিশ্চয়ই বাড়তি সতর্ক থাকবেন। মাঠের শৃঙ্খলা রক্ষায় ইভান বার্তন রসায়নের সমীকরণের মতোই নিখুঁত সিদ্ধান্ত দেবেন, এমনটাই প্রত্যাশা ফুটবলপ্রেমীদের।