বরিশালে বিচারকের এজলাসে হট্টগোল: ৯ আইনজীবীর আদালত অবমাননা

বরিশাল আদালত অঙ্গনে বিচারিক চলাকালীন নজিরবিহীন হট্টগোল, ভাঙচুর এবং বিচারকের প্রতি অসদাচরণের ঘটনায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সম্পাদকসহ নয়জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বুধবার এই আদেশ প্রদান করেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আদালতের পর্যবেক্ষণ

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন একদল আইনজীবী আকস্মিকভাবে এজলাসে প্রবেশ করেন। প্রাপ্ত তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা আদালত কক্ষে ঢুকে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন, বেঞ্চে ধাক্কাধাক্কি করেন এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিচারক এজলাস ত্যাগ করে খাস কামরায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, যার ফলে আদালতের স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে।

এই ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বরিশাল মহানগর দায়রা জজের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর একটি আবেদন এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। উক্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট বেঞ্চ এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

অভিযুক্ত আইনজীবীদের তালিকা

আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত ৯ জন আইনজীবীর নাম নিচে প্রদান করা হলো:

ক্রমিক নাম পদবি/অবস্থান
অ্যাডভোকেট সাদিকুর রহমান লিংকন সভাপতি, জেলা আইনজীবী সমিতি
অ্যাডভোকেট মির্জা রিয়াজুল ইসলাম সম্পাদক, জেলা আইনজীবী সমিতি
অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি)
অ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দিন পান্না মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি)
অ্যাডভোকেট মহসিন মন্টু সদস্য, আইনজীবী সমিতি
অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান সদস্য, আইনজীবী সমিতি
অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেক সদস্য, আইনজীবী সমিতি
অ্যাডভোকেট সাঈদ সদস্য, আইনজীবী সমিতি
অ্যাডভোকেট হাফিজ খান বাবু সদস্য, আইনজীবী সমিতি

আইনি পদক্ষেপ ও সময়সীমা

হাইকোর্টের জারিকৃত রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে—কেন উল্লিখিত আইনজীবীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু করা হবে না এবং কেন তাঁদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হবে না। আদালত এই ৯ জন আইনজীবীকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে রুলের জবাব দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১১ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ শফিকুর রহমান জানান, বিচারকের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং বিচারিক কাজে বিঘ্ন ঘটানো আইনের শাসনের পরিপন্থী। হাইকোর্ট এই ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল দিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সতর্কবার্তা

ঘটনার পর আজ বুধবার সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের বেঞ্চ সহকারী ইতোমধ্যে ‘আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন’ এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সংশ্লিষ্ট সকলকে সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। আদালতের ভেতরে কোনো ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা বা আসবাবপত্র ভাঙচুর কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আদালতের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।