খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা হৃদয় দিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন খ্রিষ্টধর্মযাজক ফাদার মারিনো রিগন — এক বিদেশি হলেও আত্মায়, মমতায় এবং কর্মে তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন বাংলাদেশি।
১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভেনেতো প্রদেশের ভিসেঞ্জা জেলার শান্তশিষ্ট ভিল্লাভেরলা গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা রিকার্ডো রিগন ছিলেন ইতালির এক জনপ্রিয় নাট্যদলের অভিজ্ঞ অভিনেতা, আর মা মনিকা জোক্কে ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ স্কুল শিক্ষিকা। পারিবারিকভাবে শিল্প, জ্ঞান ও মানবিকতার যে উত্তরাধিকার তিনি পেয়েছিলেন, তা-ই তাঁর জীবনকে করেছে মানবসেবায় নিবেদিত।
১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি প্রথম বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) আসেন। তারপর থেকে টানা ৬৩ বছর ধরে তিনি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেহলাবুনিয়া গ্রামকে করে নেন তাঁর নিজের ঘর, নিজের আপন ভূমি। এখানেই তিনি নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলেন ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যাতে আলোকিত হয় প্রান্তিক অঞ্চলের হাজারো শিশুর জীবন।
তবে তাঁর অবদান শুধু শিক্ষা বা ধর্মচর্চায় সীমাবদ্ধ ছিল না — ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের এক অকৃত্রিম বন্ধু ও নীরব যোদ্ধা। মানবতার পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে তিনি নির্ভয়ে কাজ করেছেন; তাঁর মিশন ছিল মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আহতদের সেবা করা, এবং বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের সত্য তুলে ধরা।
২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর, ৯২ বছর বয়সে তিনি ইতালিতে পরলোকগমন করেন।
কিন্তু তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল— চিরনিদ্রায় বাংলাদেশেই শায়িত হবেন।
এক বছর পর, বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় তাঁর মরদেহ আনা হয় স্বপ্নের দেশে—বাংলাদেশে। এরপর মোংলার তাঁরই প্রতিষ্ঠিত সাধুপালের ক্যাথলিক মিশন প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
ফাদার মারিনো রিগনের প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা সীমাহীন।
২০০৮ সালে সরকার তাঁকে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে,
তাঁর শিক্ষা, মানবসেবা এবং মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
মানবতার এক আলোকবর্তিকা,
বাংলাদেশের এক অকৃত্রিম হিতৈষী,
ফাদার মারিনো রিগন —
রয়ে গেছেন আমাদের মাটিতে, আমাদের স্মৃতিতে,
এক চিরন্তন প্রেরণা হয়ে।
খবরওয়ালা/এমএজেড