খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুলাই ২০২৬, ৫:৪৭ পিএম
স্মরণ
চিত্রশিল্পী আনোয়ারুল হক
(১৮ জুলাই ১৯১৮ — ১৮ নভেম্বর ১৯৮১)
বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে যে কজন শিল্পী তাঁদের সৃজনশীলতা, প্রজ্ঞা ও নিরলস সাধনার মধ্য দিয়ে শিল্পের ভিত্তি নির্মাণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন চিত্রশিল্পী আনোয়ারুল হক। তিনি ছিলেন একাধারে শিল্পী, শিক্ষক, সংগঠক এবং শিল্পচর্চার এক নিবেদিতপ্রাণ অগ্রদূত। তাঁর শিল্পসাধনা ও কর্মময় জীবন বাংলাদেশের চারুকলা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত উগান্ডায় তাঁর জন্ম। মাত্র আট বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে যান। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা সেই শহরেই তাঁর শিল্পীজীবনের বীজ রোপিত হয়। পরে তিনি কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে চিত্রকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
সেই সময় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ছবি আঁকাকে ভালো চোখে দেখা হতো না; অনেক ক্ষেত্রেই তা ছিল সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত ও ধর্মীয় কুসংস্কারে আবৃত। কিন্তু আনোয়ারুল হক সকল প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে শিল্পকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর এই সাহসী সিদ্ধান্ত পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
কর্মজীবনের শুরু ফরিদপুর জিলা স্কুলে চিত্রকলার শিক্ষক হিসেবে। পরে তিনি হাওড়া জেলা স্কুল, কলকাতা আর্ট স্কুল, চট্টগ্রাম নর্মাল স্কুল এবং পূর্ব পাকিস্তান আর্ট ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন—শিল্প শুধু আঁকার দক্ষতা নয়, এটি মানুষের মনন, রুচি ও মানবিক বোধ গড়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। সে সময় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান ও শফিউদ্দীন আহমেদ-এর সঙ্গে একযোগে ঢাকায় সরকারি আর্ট স্কুল (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের শিল্পশিক্ষার যে ভিত্তির ওপর আজকের চারুকলা দাঁড়িয়ে আছে, তার নির্মাণে আনোয়ারুল হকের অবদান অবিস্মরণীয়।
জলরং ও তেলরঙ—উভয় মাধ্যমেই তিনি ছিলেন অসাধারণ দক্ষ। তাঁর শিল্পকর্মে বাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবন, বাস্তবতার নির্মোহ প্রকাশ এবং কখনও পরাবাস্তব ভাবনার নান্দনিক রূপায়ণ এক অনন্য শিল্পভাষা সৃষ্টি করেছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শিল্পভাষাও বিকশিত হয়েছে, কিন্তু শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা কখনও বিচ্যুত হয়নি।
তিনি ছিলেন আদর্শ শিক্ষক। অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর হাতে তিনি তুলে দিয়েছেন শিল্পের তুলিকলম, জাগিয়ে তুলেছেন সৌন্দর্যবোধ, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ। চারুকলার পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিল্পচর্চার প্রসারে তাঁর অবদান আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
তাঁর অসংখ্য শিল্পকর্ম আজও সংরক্ষিত রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বঙ্গভবন, দিল্লি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহে। এসব শিল্পকর্ম তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার স্থায়ী সাক্ষ্য বহন করছে।
১৯৮১ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। কিন্তু মৃত্যু তাঁর শিল্পসাধনার ইতি টানতে পারেনি। তাঁর তুলির আঁচড়ে নির্মিত সৌন্দর্য, তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিল্পশিক্ষার ভিত্তি এবং তাঁর আদর্শ আজও বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনকে আলোকিত করে চলেছে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
“কিছু মানুষ সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। আনোয়ারুল হক তেমনই এক আলোকিত শিল্পসাধক, যাঁর তুলির রঙে, সৃষ্টির সৌন্দর্যে এবং শিক্ষকের প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের চারুকলা। জন্মবার্ষিকীতে এই মহান শিল্পীর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও বিনম্র প্রণাম।”
মন্তব্য