খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জানুয়ারি ২০২৬, ২:৮ পিএম
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬–২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জানুয়ারি–জুন) তার কঠোর মুদ্রানীতি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এখনো তাদের প্রধান ও অগ্রাধিকারমূলক লক্ষ্য। ব্যবসায়ী মহল ও বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে সুদের হার কমানোর যে ধারাবাহিক চাপ রয়েছে, তা সত্ত্বেও নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে নীতি শিথিল করলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অর্জিত স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ঘোষণা অনুযায়ী, নীতিগত সুদের হার বা রেপো রেট অপরিবর্তিত রেখে ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, তবে তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ শতাংশের সামান্য বেশি, যেখানে সরকারের পূর্ণ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত কঠোর নীতি বজায় থাকবে। সেই সীমা অতিক্রম না হওয়ায় বর্তমান অবস্থান অব্যাহত রাখা হয়েছে।
ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণেও সতর্কতার ছাপ স্পষ্ট। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যদিও বাস্তবে বর্তমানে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষাকৃত সংযত মনোভাব এবং সামগ্রিক চাহিদার দুর্বলতার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ঋণপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির নির্দেশক সীমা ১৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে, যা সরকারকে অগ্রাধিকারমূলক ব্যয় নির্বাহে কিছুটা বাড়তি সুযোগ দেবে।
গত ছয় মাসে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। গড় ঋণ সুদের হার প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছেছে এবং আমানতের গড় সুদের হার ৬ শতাংশের ওপরে উঠেছে। এতে আমানতকারীরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের কার্যক্রম ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে তিনি সুদের হার কমাতে আগ্রহী। তবে তার ভাষায়, সময়ের আগে নীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, একসময় মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা এখন কমে প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশে এসেছে। এটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও চূড়ান্ত সাফল্য নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য হলো আগামী দুই বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা।
বৈদেশিক খাতেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে অধিকতর নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা গ্রহণের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে এবং ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে। এর ফলে চলতি হিসাব প্রায় ভারসাম্যের কাছাকাছি এসেছে, আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে। জানুয়ারির শেষ দিকে মোট রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং প্রায় এক বছর ধরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ১২২–১২৩ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য জুনের মধ্যে রিজার্ভ ৩৫–৩৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।
| সূচক | বর্তমান অবস্থা | পূর্ববর্তী/লক্ষ্যমাত্রা |
|---|---|---|
| নীতিগত সুদের হার (রেপো) | ১০ শতাংশ | অপরিবর্তিত |
| মূল্যস্ফীতি (ডিসেম্বর) | ৮ শতাংশের বেশি | লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ |
| বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি | ৬.২ শতাংশ (বাস্তব) | লক্ষ্যমাত্রা ৮ শতাংশ |
| সরকারি খাতে ঋণ সীমা | ১৯ শতাংশ | পূর্বে ১৮ শতাংশ |
| গড় ঋণ সুদের হার | প্রায় ১২ শতাংশ | গত ছয় মাসে বৃদ্ধি |
| গড় আমানত সুদের হার | ৬ শতাংশের বেশি | ঊর্ধ্বমুখী |
| ডলার বিনিময় হার | ১২২–১২৩ টাকা | প্রায় এক বছর স্থিতিশীল |
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও দায়িত্বশীল পথ।
মন্তব্য