দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা খাতের ওপর সাময়িক স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে স্বস্তি ফিরেছে গ্রাহকদের মাঝে। জাতীয় পেমেন্ট সুইচ নেটওয়ার্ক ‘কিউ-ক্যাশ’ (Q-Cash)-এর আওতাধীন প্রায় ৩০টি ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, এটিএম বুথ এবং পিওএস (POS) লেনদেনসহ যাবতীয় ডিজিটাল সেবা পুনরায় চালু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপের পর গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত থেকে লেনদেন প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসি (আইটিসি), যা কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের মূল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, তাদের এক অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তিতে সেবা চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কারিগরি জটিলতা নিরসন করে সব ধরণের লেনদেন মাধ্যমকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর গ্রাহকরা এখন থেকে নিশ্চিন্তে কার্ডের মাধ্যমে এটিএম থেকে টাকা তোলা, মার্চেন্ট পয়েন্টে পিওএস মেশিনে কেনাকাটা করা এবং অনলাইন অর্থ স্থানান্তরসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সুবিধা ব্যবহার করতে পারছেন।
এর আগে গত রবিবার (৪ অক্টোবর) রাত ৯টার পর থেকে হঠাৎ করেই দেশের প্রায় ৩০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ডিজিটাল লেনদেন সেবা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। আইটিসি সূত্রে জানা যায়, সিস্টেম মাইগ্রেশন বা কারিগরি অবকাঠামো আধুনিকায়নের কাজের অংশ হিসেবে এই সাময়িক সংযোগ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটেছিল। তবে পূর্ব ঘোষণা ছাড়া বা আকস্মিকভাবে সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে ছুটির দিন কিংবা জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে ও বাজারে কেনাকাটার সময় কার্ড কার্যকর না থাকায় বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ।
ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করলে বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থেকে গ্রাহকদের কাছে মোবাইল ফোনে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো শুরু হয়। সেসব বার্তায় ব্যাংকগুলো জানিয়েছিল, সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজটি সম্পন্ন হতে সময় লাগতে পারে এবং আগামী ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টার পর সেবাগুলো স্বাভাবিক হতে পারে। টানা প্রায় ছয় দিন ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ থাকার আশঙ্কায় গ্রাহকদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপে নেয় দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কারিগরি দল গঠন ও বিষয়টির তদারকি বাড়ানো হয়। তারা প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আইটিসি-কে দ্রুততম সময়ে জটিলতা নিরসন করে সার্ভিস রিঅ্যাক্টিভেট বা পুনরায় চালু করার কড়া নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সরাসরি হস্তক্ষেপে কারিগরি দল দ্রুততম সময়ে কাজ শেষ করতে সক্ষম হয়। ফলে ব্যাংকের প্রাথমিক ঘোষিত ১০ অক্টোবরের নির্ধারিত সময়ের আগেই মাত্র দুই দিনের মধ্যে মঙ্গলবার রাতে সব সেবা আগের মতো সচল করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ডিজিটাল লেনদেনের নির্ভরতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয় কার্ড ও অনলাইন গেটওয়ের মাধ্যমে। এমন পরিস্থিতিতে কিউ-ক্যাশের মতো বড় পেমেন্ট নেটওয়ার্ক দুই দিন বন্ধ থাকায় সার্বিক ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটে। ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো সিস্টেম মাইগ্রেশন বা বড় ধরনের কারিগরি আপডেট করার আগে গ্রাহকদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে আগাম সতর্ক করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাকআপ ব্যবস্থা বা বিকল্প সার্ভার চালু রেখে মূল কাজ সম্পন্ন করার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার তাগিদ দেন তাঁরা, যাতে ব্যাংকিং সেবা পুরোপুরি থমকে না যায়।
বর্তমানে সেবাটি সম্পূর্ণ সচল রয়েছে এবং গ্রাহকরা সারা দেশের যেকোনো কিউ-ক্যাশ সমর্থিত এটিএম বুথ ও পয়েন্ট অব সেলস টার্মিনালে বাধা ছাড়াই স্বাভাবিক লেনদেন সম্পন্ন করছেন।


