খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
আচার্য ড. দীনেশচন্দ্র সেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি শুধু একজন শিক্ষাবিদ, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও লোকসাহিত্যবিশারদই ছিলেন না, বরং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও লোকসাহিত্যের গবেষণায় তাঁর অবদান আজও অমর। তাঁর কর্মজীবন, সাহিত্যচর্চা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা তাকে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে এক বিশেষ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯২১ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে সম্মানিত করে।
১৮৬৬ সালের ৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামে আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনের জন্ম। পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার সুয়াপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ঈশ্বরচন্দ্র সেন ছিলেন মানিকগঞ্জ আদালতের উকিল, আর মাতা রূপলতা দেবী ছিলেন এক গুণী ও শিক্ষানুরাগী মহিলা।
তিনি তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেন জগন্নাথ স্কুল থেকে, যেখানে ১৮৮২ সালে এন্ট্রান্স পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা কলেজ থেকে ১৮৮৫ সালে এফএ এবং ১৮৮৯ সালে বিএ পাস করেন। ছাত্রজীবনেই বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ও আগ্রহ ছিল।
১৮৮৭ সালে সিলেটের হবিগঞ্জ স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন আচার্য সেন। এরপর কুমিল্লার শম্ভুনাথ ইনস্টিটিউশন (১৮৮৯) এবং ভিক্টোরিয়া স্কুলের (১৮৯০) প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করেন। এই পুঁথিগুলি পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’-এর ভিত্তি তৈরি করে, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়।
১৯১১ সালে আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘History of Bengali Literature’ বইটি প্রকাশ করেন, যা তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও খ্যাতি এনে দেয়। ১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ ফেলোশিপ প্রদান করে। এই গবেষণা প্রকল্পের আওতায় তিনি ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’-র সম্পাদনা করেন।
তাঁর অবদানের জন্য তিনি আরও অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন:
১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.লিট ডিগ্রি।
১৯৩১ সালে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক।
১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদিত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’। তাঁর বিশাল গবেষণাকর্ম ‘বৃহৎবঙ্গ’ বাঙালির ইতিহাসচর্চায় একটি অমূল্য সংযোজন।
১৯৩৯ সালের ২০ নভেম্বর কলকাতার বেহালায় মহামানব আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর অসাধারণ গবেষণা ও সাহিত্যচর্চা আজও বাংলা সাহিত্যে আলোকবর্তিকার মতো জ্বলজ্বল করছে।