কিছু কবিতা শুধু কবিতা নয়—
কিছু কবিতা আমাদের শৈশব, আমাদের অপূর্ণতা, আমাদের না-পাওয়া স্বপ্ন, আমাদের বাবার মুখ, মায়ের আঁচল, প্রথম প্রেম আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের আয়না।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ তেমনই এক কবিতা। এখানে কবির ব্যক্তিগত স্মৃতি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে আমাদের সবার স্মৃতি; একটি মানুষের না-পাওয়ার গল্প হয়ে উঠেছে একটি প্রজন্মের দীর্ঘশ্বাস।
«“কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি…”»
ছেলেবেলার সেই বোষ্টুমী, যে কথা দিয়েছিল শুক্লা দ্বাদশীর দিন আবার আসবে—সে আর আসেনি।
মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হলে তিন প্রহরের বিল দেখাবে—কিন্তু সেই বিলও আর দেখা হয়নি।
শৈশবের আকাঙ্ক্ষাগুলো কত সামান্য ছিল—একটা রয়্যাল গুলি, একটা লাঠি-লজেন্স, দূর থেকে দেখা রাস উৎসবের আনন্দে একটু অংশ নেওয়া। অথচ সেই সামান্য পাওয়াগুলোও যেন ছিল এক অদৃশ্য নিয়তির কাছে বন্ধক রাখা।
আর তারপর আসে কবিতার সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে বেদনাময় পঙ্ক্তি—
«“বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন,
দেখিস, একদিন, আমরাও…!”»
এই অসমাপ্ত বাক্যটিই যেন পুরো কবিতার প্রাণ।
বাবার সেই আশ্বাসে ছিল অভাবের অন্ধকার পেরিয়ে একদিন ভালো থাকার স্বপ্ন। ছিল সন্তানের জন্য এক অদম্য প্রত্যাশা—একদিন আমাদেরও হবে, একদিন আমরাও আনন্দ করব, আমরাও জীবনের সুন্দর দিকটি দেখব।
কিন্তু জীবন সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করে না।
“বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই।”
এই একটি বাক্যে কবি যেন একটি পরিবারের নয়, সমগ্র মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের দীর্ঘ বঞ্চনাকে ধরে ফেলেছেন। যে বাবা সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই অন্ধ হয়ে গেলেন; অথচ সেই স্বপ্নের আলো তাঁর জীবনে আর ফিরে এল না।
তারপর আসে প্রেম।
বরুণা বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বলেছিল—ভালোবাসা সত্যি হলে তার বুকেও আতরের গন্ধ থাকবে। কবি সেই ভালোবাসার জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করতে চেয়েছেন; হাতে প্রাণ নিয়ে ছুটেছেন, বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছেন একশো আটটি নীল পদ্ম।
তবু—
বরুণাও কথা রাখেনি।
অর্থাৎ, শৈশবের প্রতিশ্রুতি রাখেনি বোষ্টুমী, কৈশোরের স্বপ্ন রাখেনি নাদের আলী, বাবার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, আর যৌবনের ভালোবাসাও শেষ পর্যন্ত কথা রাখেনি।
তাই শেষ পর্যন্ত কবির উপলব্ধি—
«“কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল,
কেউ কথা রাখে না!”»
এ যেন শুধু একজন কবির আক্ষেপ নয়—
এ আমাদের প্রত্যেকের জীবনের কোনো না কোনো অধ্যায়ের কথা।
কেউ কথা দিয়েও পাশে থাকেনি।
কেউ ফিরে আসবে বলেও আসেনি।
কেউ স্বপ্ন দেখিয়ে স্বপ্ন ভেঙেছে।
কেউ বলেছিল—“একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু সেই “একদিন” আর আসেনি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বহুমুখী ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক। তিনি একই সঙ্গে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, ভ্রমণলেখক, শিশুসাহিত্যিক ও সম্পাদক হিসেবে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর সাহিত্যজীবন বিস্তৃত ছিল প্রায় ছয় দশকজুড়ে।
১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার আমগ্রাম গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবের একটি অংশ কেটেছে বাংলার গ্রামীণ পরিবেশে; পরে পরিবার কলকাতায় চলে যায়।
১৯৫৩ সালে তিনি কয়েকজন তরুণ কবির সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন প্রভাবশালী কবিতা পত্রিকা ‘কৃত্তিবাস’। এই পত্রিকা পরবর্তী সময়ে বাংলা কবিতায় নতুন ভাষা, নতুন ছন্দ, নতুন জীবনবোধ এবং নতুন প্রজন্মের কবিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সাহিত্যিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে।
তিনি ‘নীললোহিত’, ‘সনাতন পাঠক’ ও ‘নীল উপাধ্যায়’ ছদ্মনামেও লিখেছেন। তাঁর সৃষ্টির বিস্তার ছিল বিস্ময়কর—কবিতা থেকে উপন্যাস, ইতিহাসভিত্তিক আখ্যান থেকে ভ্রমণকাহিনি, ছোটগল্প থেকে কিশোর সাহিত্য—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘আত্মপ্রকাশ’ এবং জনপ্রিয় কিশোর চরিত্র কাকাবাবুকে ঘিরে অসংখ্য উপন্যাস। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস সেই সময় তাঁকে ১৯৮৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এনে দেয়।
কবিতা ছিল তাঁর কাছে বিশেষ প্রিয়। প্রেম, যৌবন, নিঃসঙ্গতা, নগরজীবন, স্মৃতি, শরীর, আকাঙ্ক্ষা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন তাঁর কবিতায় এক অনন্য আধুনিক অনুভব নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। ‘নীরা’ তাঁর কবিতার জগতে এক স্মরণীয় নাম ও প্রতীক হয়ে আছে।
২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর, কলকাতায় ৭৮ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে হয়—
সুনীল আসলে শুধু কবিতা লেখেননি; তিনি আমাদের না-পাওয়া দিনগুলোর ভাষা লিখে গেছেন।
আমাদের ছোটবেলার সেই হারিয়ে যাওয়া উঠোন,
বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন,
প্রথম প্রেমের গোপন ব্যথা,
অপেক্ষার দীর্ঘ রাত,
আর জীবনের কাছে বারবার প্রতারিত হওয়ার অভিমান—
সবকিছুকে তিনি এমন সহজ ভাষায় লিখেছেন যে, তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়—
এ তো আমারই কথা!
এ তো আমার বাবার কথা!
এ তো আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কথা!
সুনীল চলে গেছেন।
কিন্তু তাঁর কবিতার সেই দীর্ঘশ্বাস রয়ে গেছে—
“কেউ কথা রাখেনি…”
আর আমরা আজও অপেক্ষা করি—
হয়তো কোনো একদিন,
কেউ একজন সত্যিই কথা রাখবে।
কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
জন্মদিনে বিনম্র প্রণাম।
৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ — ২৩ অক্টোবর ২০১২।



