খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ছেলে নিষাদ হুমায়ূনের স্বপ্ন বড় হয়ে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়া। পাশাপাশি বাবার মতো নির্মাতা হিসেবে জীবন কাটানোর আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে তার। নিষাদ চান সত্যজিৎ রায় কিংবা হুমায়ূন আহমেদের মতো নির্মাতা হয়ে ওঠতে।
গেল ১৩ নভেম্বর ছিল হুমায়ূন আহমেদের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী। সেদিন গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন নিষাদ।
হুমায়ূনপুত্রের সেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এক যুগেরও বেশি সময় আগে হুমায়ূন আহমেদ পৃথিবী ছেড়ে গেলেও তার গল্প, চরিত্র এবং স্মৃতি এখনো নিষাদের জীবনে আলোর মতো জ্বলে।
বাবার সৃষ্টি কোন চরিত্রটি সবচেয়ে প্রিয়—এমন প্রশ্নে নিষাদ জানান, মিসির আলীই তার সবচেয়ে পছন্দের।
তিনি বলেন, ‘বাবার লেখা অনেক গল্পের মধ্যে সবসময় মিসির আলী পড়তে ভালো লাগে। কারণ মিসির আলী সাইকোলজির মানুষ, আর আমি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হতে চাই। তাই সাইকোলজি পড়তেই হবে। এ কারণে মিসির আলী আমার কাছে সবসময় মজার লাগে। তাকে নিয়ে ভাবলে বা চরিত্রটি নিয়ে চিন্তা করলে একধরনের রহস্যের পরিবেশ তৈরি হয়। কারণ একেক বইয়ে মানুষটার বর্ণনা একেক রকম।’
নির্মাণের ইচ্ছার কথা জানিয়ে নিষাদ আরও বলেন, ‘বাবার প্রচুর নাটক আমি দেখেছি। কিন্তু এখনকার ইন্ডাস্ট্রি খুবই পচা; শুধু ভালোবাসা, এটা-সেটা নিয়ে নাটক-সিনেমা বানায়। এগুলো আমাকে টানে না। আমার ইচ্ছে আছে বাবার মতো কিংবা সত্যজিৎ রায়ের মতো নাটক-সিনেমা বানানোর। আমি চাই নতুন মানুষকে কাজের সুযোগ দিতে, যারা ফ্রেশ ভাবনা নিয়ে কাজ করবে। মানুষের জীবনের গল্প, যা আমাদের ভাবাবে—এমন সব কাজ করতে চাই। সহজ-সরল জীবন আমার খুব পছন্দ, আর সেই শান্ত জীবনের গল্পই দেখাতে চাই আমার নির্মাণে।’
নতুন প্রজন্মের কাছে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যিক সৃষ্টিগুলো তুলে ধরতে তার গল্প নিয়ে সিনেমা বানানো জরুরি বলে মনে করেন নিষাদ।
তার ভাষায়, ‘বাবার লেখা বইয়ের গল্প নিয়ে সিনেমা বানাতে পারলে ভালো হতো। এখনকার প্রজন্ম তো বই পড়ে না; অন্তত সিনেমা দেখলে তারা গল্পগুলো জানতে পারবে।’
অনেকেই নিষাদের সঙ্গে তার বাবার মিল খুঁজে পান—এমন মন্তব্যে নিষাদের মনে হয়, বাবা এখনো তার সঙ্গেই আছেন।
তিনি বলেন, ‘যখন সবাই বলে আমি বাবার মতো, তখন মনে হয় বাবা আমার সঙ্গে রয়েছে। বাবার সঙ্গে আমার খুব অল্প স্মৃতি আছে। বাবার কেমোথেরাপি চলার সময় তিনি তার কষ্ট বুঝতে দিতেন না। আমিও তখন বেশি বুঝতাম না। এসব স্মৃতি খুব মনে পড়ে।’
জন্মদিনে বাবাকে ঘিরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নিষাদ বলেন, ‘এই দিনটা আমার জন্য অসাধারণ। বাবার সঙ্গে কাটানো স্মরণীয় দিনগুলো মনে পড়ে।’
হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘নিষাদ’ নামের একটি বইকে ঘিরে নিজের শৈশবের মজার অভিজ্ঞতাও শোনান নিষাদ।
তিনি বলেন, ‘একবার বইমেলায় এক পাঠক এসে বললেন—একটা নিষাদ হবে, নিষাদ দেন তো। আমি ভাবলাম আমাকে নেবে নাকি! টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যাবে, আমাকে তার সঙ্গে চলে যেতে হবে। পরে বুঝলাম তিনি বাবার “নিষাদ” বইয়ের কথা বলছিলেন।’
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়ার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার ও নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ। আশি ও নব্বইয়ের দশকের প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন গল্পের জাদুকর। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নক্ষত্রের রাত’সহ বহু জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক নির্মিত হয়েছে তার গল্পে।
১৯৯২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শঙ্খনীল কারাগার’ সিনেমাটির গল্পকারও তিনি, যা তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা গল্পকারের সম্মান এনে দেয়।
পরবর্তীতে এক ঘণ্টার নাটক নির্মাণের মাধ্যমে পরিচালনায়ও যুক্ত হন তিনি। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’। এরপর আরও সাতটি সিনেমা নির্মাণ করেন তিনি—‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ তার উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।
হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭৩ সালে প্রথম বিয়ে করেন গুলতেকিন খানকে। তাদের চার সন্তান—নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ, বিপাশা আহমেদ ও নুহাশ আহমেদ। নুহাশ ইতোমধ্যেই পরিচালনায় নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করেছেন; তার নির্মিত নাটক ও সিরিজ প্রচারিত হয়েছে।
২০০৫ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর হুমায়ূন বিয়ে করেন মেহের আফরোজ শাওনকে। এ দম্পতির দুই সন্তান—নিষাদ আহমেদ ও নিনিত আহমেদ।
২০১২ সালের ১৯ জুলাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি নিউ ইয়র্কের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
খবরওয়ালা/টিএসএন