জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার দিবাগত রাতে উপজেলার পিংনা ইউনিয়নের কাওয়ামারা বটতলা এলাকায় এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জামালপুর ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মাসুদ মিয়া, চাঁন মিয়া, চিকিৎসক মাজহারুল ইসলাম মুকুল, আনিসুর রহমান আনিস, বাবু মিয়া, হুমায়ুন কবির, পিংনা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুভাষ সরকার, বায়েজিদ, সামাল মিয়া, শিবলু মিয়া এবং সাবেক ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পিংনা ইউনিয়নের কাওয়ামারা এলাকার রসপাল মৌজায় যমুনা নদীর চরের পাশ থেকে দীর্ঘদিন ধরে ভ্রাম্যমাণ বাল্কহেড ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তোলা হচ্ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বালু উত্তোলনের সঙ্গে ছাত্রদলের সাবেক নেতা সুভাষ সরকার জড়িত। বালু উত্তোলনের কারণে কৃষিজমি ও স্থানীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় কয়েকজন কৃষক এবং বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী এর আগে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাধা সত্ত্বেও বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকায় বিষয়টি নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাত ৯টার দিকে বালু বহনকারী একটি বাল্কহেড স্থানীয় কৃষক ও বিএনপির নেতাকর্মীরা আটক করেন।
এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাল্কহেড আটকের খবর পেয়ে সুভাষ সরকারের নেতৃত্বে প্রায় ১৫টি মোটরসাইকেলে ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল কাওয়ামারা বটতলা এলাকায় আসে। তাঁদের কয়েকজনের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় রামদা, লোহার পাইপসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। হামলা ও পাল্টা হামলায় কয়েকজন গুরুতর আহত হন। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তবে গুলিবর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
সংঘর্ষের পর আহতদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে গুরুতর আহত কয়েকজনকে জামালপুর ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে উভয় পক্ষের লোকজন রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার পরও এলাকায় উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি। রোববার দুপুরে আটক করা বাল্কহেডটি নিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকজন সেখানে এলে স্থানীয় জনতা তাঁদের মধ্যে সুভাষ সরকারের তিন সহযোগীকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরে তাঁদের বিষয়ে পুলিশ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে বলে জানা গেছে।
কৃষকদলের স্থানীয় সদস্য শামীম মিয়া অভিযোগ করেন, সুভাষ সরকার প্রভাব খাটিয়ে জোরপূর্বক বালু উত্তোলন করছেন। এর প্রতিবাদ করায় হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন সুভাষ সরকার। তাঁর দাবি, আটক করা বাল্কহেডটি তাঁর নিজের নয়; সরিষাবাড়ীর সোহাগ নামে এক ব্যক্তির। সেটি উদ্ধারের অনুরোধ পাওয়ার পর তিনি সেখানে গিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তাঁদের লোকজনের ওপরই প্রতিপক্ষের লোকজন প্রথমে হামলা চালায়।
ফলে সংঘর্ষের সূত্রপাত এবং কার পক্ষ থেকে প্রথম হামলা হয়েছে—এ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। একইভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে কারা জড়িত এবং সেটি বৈধ না অবৈধ, তা নিয়েও তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে।
সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন জানান, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে গুলিবর্ষণের বিষয়ে তাঁর কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। ঘটনার বিষয়ে তখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি বলেও জানান তিনি। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যমুনার চরাঞ্চল থেকে বালু উত্তোলনকে ঘিরে স্থানীয় কৃষক ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধের এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত মূলত দুই পক্ষের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগই সামনে এসেছে। সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, বালু উত্তোলনের বিষয়টি এবং হামলা বা গুলিবর্ষণের অভিযোগ কতটা সত্য—এসব নির্ধারণে তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি নদীর চর থেকে বালু উত্তোলনের কারণে স্থানীয় কৃষিজমি ও জনজীবনে কোনো ধরনের ক্ষতি হচ্ছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার দাবি উঠেছে।



