লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ গ্রামবাসীর অভিনব প্রতিবাদ, শপথ কর্মকর্তাকে

ভারতের উত্তর প্রদেশের গোন্ডা জেলায় দীর্ঘদিন ধরে চলা বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে এক অভিনব প্রতিবাদে। টানা লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ একদল গ্রামবাসী হাতে ‘হনুমান চালিসা’ নিয়ে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে গিয়ে এক কর্মকর্তাকে ধর্মীয় গ্রন্থ ছুঁইয়ে শপথ করে বলতে বলেন, তাঁদের এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসলে কতক্ষণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে কাটরা বাজার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত অনিয়মিত। প্রায় ছয় মাস ধরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দিনে গড়ে দুই ঘণ্টারও কম সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য যেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন, সেখানে দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষোভ জমছিল বাসিন্দাদের মধ্যে।

এই ক্ষোভ থেকেই শুক্রবার রাতে একদল গ্রামবাসী কাটরা বাজার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে উপস্থিত হন। তাঁদের হাতে ছিল হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ ‘হনুমান চালিসা’। সেখানে দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী আদর্শ কুমার ওঝার সামনে তাঁরা গ্রন্থটি রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রকৃত সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

গ্রামবাসীদের বক্তব্য, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে সরবরাহ থাকার পরও তাঁদের এলাকার ফিডারে সংযোগ বন্ধ রাখা হচ্ছে। তাঁদের সন্দেহ, কোনো কারিগরি সমস্যার কারণে নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবেই তাঁদের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি এবং বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকেও অভিযোগটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটির একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন গ্রামবাসী ওই কর্মকর্তাকে ঘিরে ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে নানা প্রশ্ন করছেন। কেউ কেউ মুঠোফোনে পুরো ঘটনার দৃশ্য ধারণ করছিলেন। কর্মকর্তার কাছে তাঁরা মূলত জানতে চাইছিলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের এলাকায় বাস্তবে কত ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেওয়া হয় এবং কেন দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনেও। ঘরবাড়ির স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ছোট ব্যবসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজেও সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে গরমের মধ্যে পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

তবে প্রতিবাদের ঘটনাকে ঘিরে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকেও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। উপসহকারী প্রকৌশলী আদর্শ কুমার ওঝা প্রায় এক ডজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন, বিদ্যুৎ বিভাগের নথিপত্র নষ্ট করেছেন এবং কর্মীদের গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও তাদের নজরে এসেছে। কাটরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনোজ পাঠকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই ঘটনায় এখন মূলত দুটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমটি হলো, স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ এবং তাঁদের দাবি অনুযায়ী প্রতিদিন খুব অল্প সময় বিদ্যুৎ পাওয়ার বিষয়টি। দ্বিতীয়টি হলো, সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা, নথিপত্র নষ্ট এবং হুমকি দেওয়ার অভিযোগ।

বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল, ফিডারে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পেছনে কারিগরি বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না এবং বিক্ষোভের সময় সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ কতটা সত্য—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের পরই পরিষ্কার হবে। আপাতত দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে গ্রামবাসীদের ক্ষোভ এবং সেই ক্ষোভ প্রকাশের অস্বাভাবিক পদ্ধতিই গোন্ডার এই ঘটনাকে আলোচনায় এনেছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।