‘লিওনেল মেসি যেন বিস্ময়বোধক চিহ্নেরই অন্য নাম’—ম্যাচে নিজের হ্যাটট্রিক পূরণ করার পরপরই দূরদর্শনের ধারাভাষ্যকার মন্তব্যটি করেছিলেন। তবে সেই হ্যাটট্রিকেই নিজেকে থামিয়ে রাখেননি আর্জেন্টাইন ফুটবলের এই বরপুত্র। রাতের শুরুটা একটি নিখুঁত ফ্রি কিকে করেছিলেন, আর শেষটাও করলেন ঠিক একই কায়দায় আরেক ফ্রি কিকে বল জালে জড়িয়ে। মাঝে মাঠজুড়ে ছড়ালেন অপরিসীম মুগ্ধতা; নিজে আরও দুই গোল করার পাশাপাশি সতীর্থ লুইস সুয়ারেজকে দিয়ে করালেন আরেকটি গোল।
অধিনায়কের এমন অবিশ্বাস্য ও ব্যক্তিগত চার গোলের প্রদর্শনীতে সিএফ মন্ট্রিয়লকে ৭-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে ইন্টার মিয়ামি। এই ঝোড়ো জয়ের মধ্য দিয়ে ক্লাবটি তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের নতুন রেকর্ড গড়ল। একই সাথে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা পাঁচ ম্যাচে জয়হীন থাকার বৃত্ত থেকেও বেরিয়ে এল মিয়ামির দলটি। ২৫ জুলাইয়ের পর এটাই এমএলএসে তাদের প্রথম জয়, যার মাঝে লিগস কাপের ব্যর্থতাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ম্যাচ শুরুর আগে ড্রেসিংরুম ও ভক্তদের মনে অনিশ্চয়তা ছিল তুঙ্গে। ডাগআউটে ছিলেন না কোনো স্থায়ী প্রধান কোচ। মিয়ামির নতুন স্থায়ী কোচ হিসেবে ক্রিস্টিয়ান ‘কিলি’ গঞ্জালেজের নাম ঘোষণা করা হলেও কাজের প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) জটিলতায় তিনি দল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেননি। তদুপরি অন্তর্বর্তীকালীন কোচ গিয়ের্মো ওয়োস নিষেধাজ্ঞার কারণে মাঠের বাইরে থাকায় সহকারী কোচ রাফায়েল পেরেজ দলকে নির্দেশনার দায়িত্ব সামলান। কিন্তু মাঠের সব জটিলতা যেন মুহূর্তেই একপাশে সরিয়ে দিলেন ৮ বারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী মেসি।
ম্যাচের ৪০ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত এক ফ্রি কিকে খাতা খোলে মিয়ামি, যেখানে বল প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের গায়ে লেগে জালে প্রবেশ করে। এরপর বিরতির পর ৫২ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে একক বুদ্ধিমত্তায় বল টেনে নিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। এর কিছুক্ষণ পরেই সুয়ারেজকে দিয়ে গোল করিয়ে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে নেন। খেলা শেষ হওয়ার সাত মিনিট আগে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে আলতো করে বল জালে পাঠিয়ে চলতি মৌসুমে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি।
তবে নাটকের শেষ সেখানেই ছিল না। ম্যাচের যোগ করা অতিরিক্ত সময়ে বক্সের কিছুটা দূর থেকে নেওয়া মেসির দ্বিতীয় ফ্রি কিকটি বাঁক খেয়ে সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ে জালের ওপরের কোণায়। এর মাধ্যমে মিয়ামির জার্সিতে প্রথমবারের মতো এক ম্যাচে চার গোল করার কীর্তি গড়লেন তিনি। আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ক্যারিয়ার মিলিয়ে এটি মেসির অষ্টম চার বা ততোধিক গোল করার ম্যাচ। এর আগে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্সেলোনার হয়ে স্প্যানিশ ক্লাব এইবারের বিরুদ্ধে শেষবার চার গোল করেছিলেন তিনি।
এই ম্যাচে মিয়ামির হয়ে বাকি দুটি গোল আসে গ্রীষ্মকালীন দলবদলে মিয়ামিতে যোগ দেওয়া ব্রাজিলীয় তারকা কাসেমিরো এবং ১৮ বছর বয়সী উদীয়মান তারকা আলেকজান্ডার শ-এর পা থেকে। কাসেমিরো মিয়ামির হয়ে নিজের প্রথম গোলটি করেন, আর শ ৮৯ মিনিটে ম্যাচের ষষ্ঠ গোলটি করেন।
এক নজরে সিএফ মন্ট্রিয়ল বনাম ইন্টার মিয়ামির ঐতিহাসিক ম্যাচের প্রধান ডেট পয়েন্ট ও পরিসংখ্যানগুলো নিচে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় ও পরিসংখ্যান | বিস্তারিত তথ্য |
| চূড়ান্ত ফলাফল | ইন্টার মিয়ামি ৭ – ১ সিএফ মন্ট্রিয়ল |
| মেসির ব্যক্তিগত গোল সংখ্যা | ৪টি (৪০’, ৫২’, ৮৩’, ৯০+ মিনিট) |
| মেসির অ্যাসিস্ট সংখ্যা | ১টি (লুইস সুয়ারেজকে প্রদান করা গোল) |
| কাসেমিরোর পারফরম্যান্স | মিয়ামির হয়ে অভিষেক গোল অর্জন |
| আলেকজান্ডার শ-এর গোল | ৮৯ মিনিটে (বয়স ১৮ বছর) |
| মেসির ক্যারিয়ারে চার গোলের রেকর্ড | মোট ৮ বার (মিয়ামির হয়ে প্রথম) |
| বার্সেলোনায় মেসির শেষ চার গোল | ফেব্রুয়ারি ২০২০ (প্রতিপক্ষ: এইবার) |
| এমএলএস মৌসুমে মেসির অবস্থান | ১৯ ম্যাচে ১৮ গোল (শীর্ষ গোলদাতা) |
| তালিকায় দ্বিতীয় শীর্ষ গোলদাতা | পিটার মুসা (এফসি ডালাস) |
| ইন্টার মিয়ামির জয়ের খরা অবসান | ২৫ জুলাইয়ের পর প্রথম জয় (৫ ম্যাচ পর) |
| ইস্টার্ন কনফারেন্সে মিয়ামির অবস্থান | ২য় স্থান (শীর্ষে ন্যাশভিল এসসি) |
| ইস্টার্ন কনফারেন্সে মন্ট্রিয়লের অবস্থান | ১৪তম স্থান (তালিকার তলানিতে) |
| ডাগআউটে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক | সহকারী কোচ রাফায়েল পেরেজ |
| নতুন ঘোষিত প্রধান কোচ | ক্রিস্টিয়ান ‘কিলি’ গঞ্জালেজ (অনুমতি অপেক্ষমাণ) |
ম্যাচে চার গোলের সুবাদে চলতি মৌসুমে মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় একচ্ছত্র শীর্ষে উঠে এসেছেন লিওনেল মেসি। বর্তমানে ১৯ ম্যাচে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ১৮টি গোল। এই তালিকায় তাঁর ঠিক পরেই অবস্থান করছেন এফসি ডালাসের স্ট্রাইকার পিটার মুসা। এই স্মরণীয় জয়ের পর ইস্টার্ন কনফারেন্সের পয়েন্ট টেবিলে নিজেদের দ্বিতীয় স্থান মজবুত করেছে ইন্টার মিয়ামি, যেখানে টেবিলের শীর্ষে রয়েছে ন্যাশভিল এসসি। বিপরীতে এই হারের পর ১৪ নম্বর স্থানে নেমে গিয়ে পয়েন্ট তালিকার তলানিতে আটকে রইল মন্ট্রিয়ল।



