ভয়াবহ খরতাপের মধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। শনিবার বিকেলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। মূলত আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কমে যাওয়া, দেশের বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের গ্রামগঞ্জে দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। একই সাথে ভয়াবহ চাপে পড়েছে দেশের শিল্প খাতের উৎপাদন।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সংকটময় চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। দিনের শুরু থেকেই চাহিদার তুলনায় উৎপাদনে বড় অঙ্কের তফাত দেখা যায়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যকার এই ব্যবধান আরও চওড়া হয়।
এক নজরে বিদ্যুতের সময়ভিত্তিক চাহিদা ও ঘাটতির চিত্র
| সময় | জাতীয় চাহিদার পরিমাণ (মেগাওয়াট) | গ্রিডে সরবরাহকৃত বিদ্যুৎ (মেগাওয়াট) | মোট ঘাটতি বা লোডশেডিং (মেগাওয়াট) |
| শনিবার বিকেল ৫:০০ | ১৬,৪৬৯ | ১২,৯৫২ | ৩,৫১৭ |
| শনিবার সন্ধ্যা ৬:০০ | ১৬,৩৮৯ | ১৩,৩৬২ | ৩,০২৭ |
| শনিবার সন্ধ্যা ৭:০০ | ১৭,৫৪১ | ১৪,৫৩১ | ৩,০১০ |
| শনিবার রাত ৭:৩০ | ১৭,৫৫১ | ১৫,০১৯ | ২,৫৩২ |
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় উৎস হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। তবে এই প্রাথমিক জ্বালানির অভাবেই মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাক্কা খেয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, শনিবার রাত পর্যন্ত দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২১৯ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ১৬১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট পাওয়া গেলেও এলএনজি থেকে এসেছে মাত্র ৫৮ কোটি ঘনফুট। অথচ কয়েক দিন আগেও এলএনজি থেকে দৈনিক ৭৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। শনিবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টা রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্য সামিটের এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ ছিল। কেবল এক্সিলারেটের টার্মিনাল দিয়ে কিছু পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ রাখা সম্ভব হয়।
গ্যাস সরবরাহ ঘাটতির নেপথ্যে রয়েছে এলএনজি কার্গো সময়মতো না পৌঁছানো। সেপ্টেম্বর মাসের ১ ও ৪ তারিখে দুটি কার্গো আসার দিনক্ষণ নির্ধারিত থাকলেও তার আগের ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশে গ্যাসের দৈনিক সরকারি চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে প্রকৃত চাহিদা ৫০০ থেকে ৫এসও কোটি ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতা স্বীকার করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান, পায়রা, ভারতের আদানি এবং মাতাবাড়ীর মতো বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। কয়লা সংকটে আদানির কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের কারণে মাতারবাড়ীর একটি ইউনিট বন্ধ রাখতে হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে সত্তর কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে আটকে আছে। কয়লা ও গ্যাসের এই ঘাটতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালুর চেষ্টা করা হলেও সেখানে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় উৎপাদন বাড়ানো যায়নি।
জ্বালানির এই ত্রিমুখী সংকটে গৃহস্থালি ও কারখানা—উভয় খাতেই নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ না থাকায় বিকল্প হিসেবে অনেকে ইন্ডাকশন কিংবা রাইস কুকারের ওপর নির্ভর করছিলেন। কিন্তু বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় রান্নাবান্নার মতো নিত্যদিনের কাজ স্তব্ধ হয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত এলপিজি ব্যবহার করতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে।
একই চিত্র শিল্পাঞ্চলেও। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর মতো শিল্পঘন এলাকাগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। লোডশেডিং সামলাতে গিয়ে মিল-কারখানাগুলোতে অনবরত চালানো হচ্ছে ব্যয়বহুল ডিজেল জেনারেটর। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ে রপ্তানি আদেশ শেষ করা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন শিল্পমালিকেরা। এ ছাড়া সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনের দীর্ঘ সারি জমে থাকতে দেখা গেছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সামনে লোডশেডিং আরও চরম রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


