মনজুর রশীদ
প্রকাশ: 5শে আশ্বিন ১৪৩২ | ২০ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
প্রফেশনাল জীবনে খুব কম ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান যারা কখনোই তাদের সুপারভাইজার বা বসদের দ্বারা কোনরূপ বিড়ম্বনার স্বীকার হননি। এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা হলেও কর্মজীবনে এমন কিছু অদ্ভুত প্রজাতির বস এর অধীনে কাজ করতে হতে পারে যিনি বা যারা নিজের ক্ষমতা ও আচরণের মাধ্যমে অফিসের কর্ম পরিবেশ নষ্ট করেন, কর্মীদের মানসিক চাপ ভয়ংকরভাবে বাড়িয়ে দেন, এবং তাদের কাজ ও আত্মবিশ্বাসকে মারাত্মক চাপের মধ্যে রেখে কর্ম ও ব্যক্তি জীবনকে ভয়ংকর দূর্বিষহ করে তুলে তৃপ্তি অনুভব করেন। এদেরকেই মূলত টক্সিক বস (Toxic Boss) বলে অভিহিত করা হয়।
এ জাতীয় টক্সিক বসের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে কারো কারো প্রতি অস্বাভাবিক পক্ষপাতিত্বসুলভ আচরণ ও সবখানে সেই প্রিয়জনদেরকে অন্য সহকর্মীদের চেয়ে উঁচু হিসেবে প্রতিপন্ন করা, এর বাইরের অন্যসকল কর্মীদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন না করা, কারণে অকারণে মাত্রাতিরিক্ত সমালোচনা করা ও তীর্যক ভাষায় সারাক্ষণ তাদের সাথে ধমকের সুরে কথা বলা, এবং তাদের সাফল্যকে হুমকি হিসেবে দেখা। আধুনিক কর্মজীবনের বাস্তবতা বলছে, অনেক সময়ই এরকম একজন ‘টক্সিক বস’ হয়ে ওঠেন কর্মক্ষেত্রের বিষাক্ত বাতাসের উৎস। তার আচরণ ও কার্যকলাপের মাধ্যমে নিজের কর্মক্ষেত্রে তিনি নিজেই ছড়িয়ে দেন ভয়ংকর বিষ।
দীর্ঘ কর্মজীবনে এমন কিছু টক্সিক বসের সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে যা থেকে আপনিও চিনে নিতে পারেন এদের কমন বৈশিষ্ট্যগুলো। যেমন – আপনার ভেতরের গুণাবলীকে বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টির চেয়ে কীভাবে আপনাকে মানসিক ও পেশাগতভাবে দুর্বল করে করে রাখা যায়, কিভাবে আপনার কর্ম উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়া যায়, বেশিরভাগ সময় খুঁত ধরার মাধ্যমে আপনার মাঝে কাজের প্রতি অনীহা তৈরির সুযোগ তৈরি করে আরও বেশি বেশি বকাঝকা বা কটু কথা শোনানো যায়, নিজেকে সবজান্তা মনে করে সব বিষয়েই জ্ঞান প্রদানের প্রবণতা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রচেষ্টা এদের অন্যতম সহজাত বৈশিষ্ট্য। এজন্য টক্সিক বসদের অন্যতম লক্ষ্য থাকে সবার মনোযোগ শুধু তাকে ঘিরেই হবে। যে কোনো কিছুতে তিনি নিজেই এগিয়ে থেকে প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠতে ভালবাসেন।
এ রকম বসরা কাজের বিষয় ছাড়াও কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখান, একইসাথে তাদের ব্যক্তিগত সমালোচনা করতে পছন্দ করেন। তারা কাউকে অপমানসূচক কথা বলতে কোনরকম দ্বিধাবোধ যেমন করেন না, আবার অন্যকে সম্মান দিতেও জানেন না। বিপরীতে অন্যদের ছোট করে কথা বলতে পছন্দ করেন। তাদের কথায় কেউ আঘাত পেলেও তা একদমই গায়ে মাখেন না।
কর্মীদের ভেতর টিম বিল্ডিং এর কথা বলে কিভাবে পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গা বিনষ্ট করা যায় —সেটা তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট কিছু তৈলমর্দনকারী কর্মীকে সব কাজে যোগ্য বিবেচনা করে অন্যদের চেয়ে বেশি সুযোগ করে দেয়া এবং পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে অন্যদেরকে বারবার তার আস্থাভাজনদের কাছে ছোট করার প্রবনতা এদের মধ্যে তীব্রভাবে লক্ষ্য করা যায়।
এ রকম টক্সিক বসরা কর্মীদের সাফল্যকে সবসময় হুমকি বলে মনে করে। কিন্তু সাফল্যকে আবার অন্যদের সামনে নিজের সাফল্য হিসেবে দেখাতে পছন্দ করেন। আপনি রাত জেগে প্রেজেন্টেশন বানালেন, প্রজেক্ট করলেন দিন-রাত এক করে। কিন্তু ক্লায়েন্ট মিটিং এ এসে দেখলেন, বস হাসিমুখে বলছেন, “আমার টিম তো আমার প্ল্যানেই কাজ করেছে।” আবার যে কোন বড় ধরনের সেমিনার, কনফারেন্সে আপনার তৈরি করা কাজকেই নিজের সফলতা হিসেবে দেখাবেন। তিনি ভালে করেই জানেন আপনি কী করেছেন, কিন্তু তা সামনে আনবে না। কারণ, আপনার সাফল্য তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিতে পারে। অফিস এমনকী তার পরিবারের কাজেও অধস্তন কর্মীদের তারা দাসের মত ব্যবহার করেন, কর্মীদের সব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা এবং তাদেরকে কক্ষনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়াও এ জাতীয় বসদের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
এ রকম টক্সিক বসদের আরেকটা দিক খুবই লক্ষ্যনীয় তা হল চিরন্তন ‘মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট’। প্রতিটি ইমেল, প্রতিটি কল, এমনকি আপনি কি জামা-কাপড়, জুতা বা গয়না পড়ে অফিসে এসেছেন, কীভাবে বসে আছেন, সবকিছুতেই নজর তার। আপনাকে কোন কাজ দিয়ে একটা ডেডলাইন দিয়েই খালাস। সময়মতো রাত-দিন পরিশ্রম করে কাজটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে তাকে জমা দিলেও তার তা দেখার সময় নেই। আবার অন্য কাজের চাপে খানিকটা দেরি হলেই টের পাবেন তার ভয়ংকর চেহারা।কোন কোন টক্সিক বস আবার খুব মনোযোগ সহকারে এসাইনমেন্টগুলো দেখেন, যেখানে উদ্দেশ্যই থাকে কেবল ভুল খুঁজে বের করে আপনাকে অপদস্ত করা। সুপারভাইজার হিসেবে নিজে সেখানে সংশোধনের বিন্দুকনা দায়িত্ব পালন না করে বা একটু ভালো আচরণ করে তা সংশোধনের দিক নির্দেশনা না দিয়ে আপনাকে কষ্ট দিতে তারা ভালোবাসেন।
পারিবারিক ও শারিরীক কারণে আপনারও যে কোন সমস্যা থাকতে পারে, সেদিকে তার নজর নেই। তার কোন বিশ্বাসও নেই যে আপনি আপনার নিজের কাজ খুব ভালভাবেই সামলাতে পারেন। তিনি কোনকিছুকে ভুল বললে তা ভুল বলে মেনে নিতে হবে, তিনি যা পছন্দ করেন–অন্য সকলকেও সেটাই পছন্দ করতে হবে। তিনি হাসলে আপনাকেও হাসতে হবে। তার মন খারাপ থাকলে আপনাকেও তার জন্য বিষন্ন হতে হবে!
সবার সামনে তিনি আপনার খুঁত ধরবেন, খোঁটা দেবেন, এমনকি তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করবেন। যেন আপনি নন, আপনার ‘অপমান’ই তার ‘পাওয়ার ডিসপ্লে’। ব্যক্তিগত বা পেশাদার সীমা এখানে খুব হালকা হয়ে যায়। চাকরি হারানোর ভয়ে, নিজের উপর আস্থাহীনতার কারণে অথবা অন্যদের পথ অনুসরণ করে অনেকেই এমন ধরনের বসদেরকে সারাক্ষণ নমঃ নমঃ করে থাকেন। কিন্তু তাদেরও মনে রাখা উচিত বস হলেও তিনি কিন্তু ব্যক্তি মানুষের মালিক নন। নিছকই একজন ঊর্ধ্বতন সহকর্মী। তাই একজন সহকর্মী হিসাবে অধস্তন হলেও যথেষ্ট সম্মান তারও প্রাপ্য। এই বোধ ও আচরণ একজন প্রকৃত প্রফেশনালের ব্যক্তিত্বকেও কিন্তু প্রকাশ করে।
অফিস শেষে রাতভর কাজ করানো, ছুটির দিনে কাজ করা মানেই টিমস্পিরিট—এমন মানসিকতাও টক্সিক বসদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আপনার জীবন, ঘুম, শরীর–কিছুই তাদের পরোয়া করার বিষয় নয়। কাজের মানের থেকেও কাজের সময় তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কাজ যতই ভাল হোক, তার থেকেও বেশি নজর আপনি তার ঠিক করে দেওয়া নিয়ম মেনে চলছেন কি না। ভালো কিছু করলে প্রশংসা করাকে তারা গুনাহের কাজ বলে মনে করেন। নিজে যেহেতু তেমন একটা কাজ করেন না, পুরোটাই অধীনস্তদের উপর নির্ভর করতে হয়, তাই আপনার প্রাপ্য ছুটি চাইলে তিনি এমন আচরণ করবেন যেন আপনি তার কিডনি চেয়ে বসেছেন।
টক্সিক বসরা অন্যের কথা শুনতে পছন্দ করেন না। এরা যেকোনো কথোপকথনের সময় অন্যের মনোভাব প্রকাশে বাধা দেন। নিজের কথা বলতেই ব্যস্ত থাকেন অবিরাম গতিতে, কখনো ঘন্টার পর ঘন্টা। আপনি কিছু বললে বা বলতে চাইলেও তারা তা আমলেই নেবে না। এসব বসরা সহকর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারে না। তাদের মধ্যে ভয়ংকর ভাবে সহমর্মিতার অভাব থাকে। কারো খারাপ সময়ে এরা যেমন পাশে থাকেনা, আবার দায়িত্বশীলতার দিক থেকেও এদের মধ্যে শুধু প্রভুসুলভ আচরণ লক্ষ্যনীয়। কারো প্রতি শ্রদ্ধা বা সম্মান প্রদর্শন নিজে না করলেও তার প্রতি বিশাল সম্মান প্রদর্শন সকলকেই করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা মারাত্মক স্বার্থপর হয়ে থাকেন।
এরকম ত্যক্ত-বিরক্ত করা টক্সিক বসদের জন্য আপনার কর্ম, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন দূর্বিষহ হয়ে উঠলেও অনেকে জীবন-জীবিকার তাগিদে তা সহজে মেনে নেন। কিন্তু এ থেকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কিন্তু নানা ধরনের পলিসি আছে। যা স্টাফদের সুরক্ষার জন্য করা হলেও বস ক্ষুব্ধ হলে তাকে অপরাধী প্রমাণ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য একটা ব্যাপার। কারণ টক্সিক বসদের দাপট ও প্রভাব সংস্থার ভেতর শক্ত বলেই তারা এমনটা করার দুঃসাহস দেখায়, যেখানে নিরীহ অধস্তন কর্মীরা বরাবরই বড় অসহায়!
লেখক ও কলামিস্ট
খবরওয়ালা/এমইউ