খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
ফরিদপুর শহরের একটি তিনতলা ভবনের বিশাল ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন একাকী জীবন কাটানোর পর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো কোয়েল চৌধুরী (৫৪)-এর জীবনের গল্প। অচেতন অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর খবর কানাডাপ্রবাসী একমাত্র বোন ও অন্যান্য স্বজনদের জানানো হলেও কেউ শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে আসেননি। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় শহরের আলীপুর কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার সকালে পূর্ব খাবাসপুর এলাকার ‘চৌধুরী ভিলা’ ভবনের এক ভাড়াটিয়া প্রতিদিনের মতো কোয়েল চৌধুরীর জন্য খাবার নিয়ে যান। দীর্ঘ সময় দরজায় ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি প্রতিবেশীদের খবর দেন। পরে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা ভেঙে তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে।
উদ্ধারের সময় তাঁর চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন উপস্থিত কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা জানান, তিনি আর বেঁচে নেই।
প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোয়েল চৌধুরীর বাবা হাশমত আলী চৌধুরী ও মা আছিয়া খানম সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। ২০০০ সালের দিকে তাঁরা পূর্ব খাবাসপুর এলাকায় ভবনটি কিনে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা একে একে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরিবারের একমাত্র মেয়ে উচ্চশিক্ষা ও স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে কানাডায় চলে যান। বাড়িতে থেকে যান দুই ছেলে—বাবু চৌধুরী ও কোয়েল চৌধুরী।
স্থানীয়দের মতে, দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগলেও তাঁদের আচরণ ছিল শান্ত ও নিরীহ। কখনো কারও সঙ্গে বিরূপ আচরণ কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেখা যায়নি। বরং শহরের মানুষ তাঁদের প্রায়ই পাশাপাশি হাঁটতে দেখতেন। কখনো ধীর পায়ে পাশাপাশি, কখনো আবার হাত ধরে রাস্তায় হাঁটতেন দুই ভাই। তাঁদের পারস্পরিক স্নেহ ও নির্ভরতার সম্পর্ক এলাকার মানুষের কাছেও পরিচিত ছিল।
কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যু হলে কোয়েল চৌধুরী সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। বিশাল ফ্ল্যাটে তাঁর একাকী জীবন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে। পরিবারের কেউ নিয়মিত খোঁজ না নিলেও ভবনের ভাড়াটিয়ারা মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তাঁর খাবারের ব্যবস্থা করতেন। প্রতিবেশীরাও সময়-সুযোগে খোঁজখবর রাখতেন এবং প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করতেন।
প্রতিবেশী আশিকুর রহমান খান জানান, সেদিন সকালে ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ার পরই তাঁরা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করলেও হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মৃত্যুর খবর কানাডাপ্রবাসী বোনকে জানানো হলে তিনি স্থানীয়দেরই দাফনের ব্যবস্থা করতে বলেন। অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়া হলেও কেউ সময়মতো উপস্থিত হননি। শেষ পর্যন্ত এলাকার মানুষের উদ্যোগে কোয়েল চৌধুরীকে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়। পরে দূর সম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয় কবরস্থানে এলেও দাফনের আগ পর্যন্ত পরিবারের ঘনিষ্ঠ কোনো সদস্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দেড় বছর আগে বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যুর সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, ছোটবেলায় বাবা-মা কর্মস্থলে যাওয়ার আগে দুই ভাইকে নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খাওয়াতেন। স্থানীয়দের মধ্যে এমন আলোচনা থাকলেও এ দাবির পক্ষে কোনো সরকারি বা চিকিৎসাগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচিত নয়।
এ বিষয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদুল হাসান বলেন, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কোয়েল চৌধুরীকে উদ্ধার করে। তখন তিনি জীবিত ছিলেন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে মৃত্যুর পর এ বিষয়ে থানাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আর কেউ অবহিত করেননি।
কোয়েল চৌধুরীর মৃত্যু শুধু একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, একাকীত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শেষ মুহূর্তে স্বজনদের উপস্থিতি না থাকলেও প্রতিবেশীদের মানবিক উদ্যোগই তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে উঠেছে।