খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৪৮ পিএম
দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি দ্রুত বাড়লেও নগদ অর্থের ব্যবহার কমছে না। বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেড়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে শেষে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। জুন ও জুলাইয়ে তা আরও বেড়ে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার এবং ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়নের পরও নগদের ওপর নির্ভরতা বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নগদনির্ভর ব্যবসা, বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, সীমিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংক খাতে আস্থার ঘাটতি—সব মিলিয়ে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটি অংশ ব্যাংকের বাইরে অর্থ ধরে রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, এক দশকের বেশি সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত নগদ অর্থের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়েছে। ২০১১ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। ২০২১ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ কোটি টাকায়। ২০২২ সালের জুনে ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৮ কোটি এবং ২০২৩ সালের জুনে ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে এই পরিমাণে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও চলতি বছরে আবার বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে। গত বছরের জুনে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের মে শেষে সেটি বেড়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এরপর জুনে তা ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং জুলাইয়ে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, জুনে কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতাও নগদ অর্থ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তার সময় কিছু গ্রাহক ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেন।
ওই সময়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার আমানত বেরিয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকটিকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিতে হয়। পরে ব্যাংকটির দৈনন্দিন লেনদেন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে এবং আতঙ্কে অর্থ তুলে নেওয়া কিছু গ্রাহক আবার আমানত ফিরিয়ে আনেন।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে নিযুক্ত প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন জানিয়েছেন, ব্যাংকটির নিয়মিত কার্যক্রম এখন স্বাভাবিক রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে।
তবে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বাড়লেও ব্যাংক আমানতে একই সময়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই বৃদ্ধি ছিল ৮৯ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা।
মে শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকদের মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়ায় ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। ওই সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা যত আধুনিক হচ্ছে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার তত কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ এবং ব্যাংক আমানত—দুটিই বাড়ছে। এই বৈপরীত্যের কারণ অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তার মতে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বড় থাকার অর্থ হলো অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো প্রচলিত ব্যাংকিং ও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। এসব অর্থের উৎস বৈধ কি না এবং এর বিপরীতে যথাযথ কর পরিশোধ করা হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ব্যাংকের প্রতি অনাস্থা, ঘুষ-দুর্নীতি এবং কালোটাকার বিস্তার থাকলেও নগদ অর্থের চাহিদা বাড়তে পারে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিনের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে বেশি পরিমাণ অর্থ হাতবদল হচ্ছে এবং এর একটি বড় অংশ নগদ আকারে ঘুরছে।
তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নেমে এলে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। দেশের বিপুলসংখ্যক দোকান ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় কিউআর কোড, পস মেশিন, কার্ড এবং ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাংকিং সুবিধার বিস্তার এখনো পর্যাপ্ত নয়।
গত কয়েক বছরে দেশে প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। অধিকাংশ ব্যাংক ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড সেবা চালু করেছে। ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও মাসে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি আরটিজিএস, এনপিএসবি ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট মাধ্যম সম্প্রসারণে কাজ করছে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থ লেনদেন এখন দেশের দৈনন্দিন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তারপরও ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের সব মার্চেন্টকে বাংলা কিউআরের আওতায় আনা হয়েছে এবং ডিজিটাল পেমেন্টের বিভিন্ন মাধ্যম আগের তুলনায় দ্রুত ও জনপ্রিয় হয়েছে। এর পরও নগদ অর্থ বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেগের। মানুষ ব্যাংকবিমুখ হয়ে যাচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, ২০২২ সাল থেকে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব রয়েছে। পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাওয়ায় একই ধরনের কেনাকাটায় মানুষকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর একটি অংশ আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছেন। এসব কারণও ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের দ্রুত বৃদ্ধি শুধু নগদ ব্যবহারের প্রবণতা নয়; এটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার এবং মূল্যস্ফীতির চাপেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে।
একদিকে ব্যাংক আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকের বাইরে নগদ হিসেবে অবস্থান করছে। এর অর্থ হলো অর্থনীতিতে একাধিক ধরনের সঞ্চয় ও লেনদেনের প্রবণতা একই সময়ে কাজ করছে। ফলে শুধু ডিজিটাল পেমেন্টের সংখ্যা বাড়লেই নগদ অর্থের ব্যবহার কমবে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।
ব্যাংকারদের মতে, নগদনির্ভরতা কমাতে শুধু প্রযুক্তি সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষের ব্যাংকের ওপর আস্থা বাড়ানো, প্রত্যন্ত ও আধা-শহুরে এলাকায় নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্টে যুক্ত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকের বাইরে থাকা ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ তাই কেবল একটি বড় অঙ্কের পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের ভোগব্যয়, ব্যবসায়িক লেনদেন, ব্যাংক খাতে আস্থা, করব্যবস্থা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নগদ অর্থের এই প্রবাহ কোন কোন খাত থেকে আসছে এবং কোথায় যাচ্ছে, তার একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া গেলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার বর্তমান প্রবণতাও আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
মন্তব্য