খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ২:১৩ পিএম
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে লাতিন আমেরিকার জনপ্রিয় ফুটবল দল ব্রাজিলের ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর চরম হতাশায় রতন (১৯) নামের এক তরুণ সমর্থক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। গত সোমবার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াইঘাট এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। মাত্র দুই মাস বয়সী কন্যাসন্তানের জনক এই যুবকের আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুতে পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত রতন কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াইঘাট এলাকার হোসেন মিস্ত্রীর সেজো ছেলে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন রতনের ঘরের দরজা দীর্ঘ সময় ধরে ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। একপর্যায়ে বাড়ির লোকজন তাকে ডাকাডাকি শুরু করে। দীর্ঘক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। পরে তারা ঘরের জানালায় উঁকি দিয়ে রতনকে ঘরের আড়ার সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। স্বজনদের চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে ঘরের দরজা ভেঙে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রতনের মৃত্যু হয় এবং কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এলাকাবাসী ও রতনের বন্ধুদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রতন অত্যন্ত বিনয়ী, শান্ত স্বভাবের ও ভালো ছেলে হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। তবে ফুটবল খেলার প্রতি তার ছিল তীব্র জোশ ও উন্মাদনা। তিনি ব্রাজিল ফুটবল দলের একজন অন্ধ ভক্ত ছিলেন। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের অনাকাঙ্ক্ষিত পরাজয় ঘটে। এই হারের পর থেকেই রতন মানসিকভাবে চরম ভেঙে পড়েছিলেন এবং এক ধরনের তীব্র হতাশায় ভুগছিলেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। প্রিয় দলের এমন পারফরম্যান্স তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে তিনি এই আত্মঘাতী পথ বেছে নেন।
ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে কয়া ইউনিয়নে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক ও মর্মান্তিক বলে অভিহিত করেছেন কয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইউনুস আলী। তিনি তরুণ সমাজকে খেলাধুলাকে বিনোদন হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, কয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুমন জানান, যুবকের আত্মহত্যার খবর তিনি পেয়েছেন এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে ঘটনাটি কেবল ফুটবল দলের পরাজয়ের কারণেই ঘটেছে কি না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কারণ রয়েছে, তা তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেননি।
ঘটনার পর পরই কুমারখালী থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কুমারখালী থানার ওসি (তদন্ত) আমিরুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তবে নিহতের পরিবার এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ বা সন্দেহ প্রকাশ করা হয়নি। একই সাথে পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের জন্য প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং কোনো অভিযোগ না থাকায় পুলিশ মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে দাফনের অনুমতি প্রদান করেছে।
ফুটবল খেলা নিয়ে আমাদের দেশের দর্শকদের আবেগ ও উন্মাদনা নতুন কিছু নয়। তবে এই আবেগের আতিশয্যে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রতনের মতো একজন উঠতি বয়সের তরুণ, যার সামনে পড়ে ছিল এক দীর্ঘ ভবিষ্যৎ এবং মাত্র দুই মাস বয়সী এক অবুঝ শিশু সন্তান, তার এমন চলে যাওয়া সাধারণ মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা সবসময়ই পরামর্শ দেন, খেলাধুলাকে বিনোদনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত, একে কখনো জীবন-মরণের প্রশ্ন বা ব্যক্তিগত মর্যাদার লড়াই হিসেবে নেওয়া সমীচীন নয়। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রাণই কেড়ে নেয় না, বরং পুরো পরিবারকে ঠেলে দেয় এক অনন্ত অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার দিকে।
মন্তব্য