মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে স্মরণকালের ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তা ১৯৮৩ সালে ফিউচারস বা আগাম লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক প্রবৃদ্ধি হিসেবে রেকর্ড গড়ল। ভূ-রাজনৈতিক এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি কেবল তেলের দামই বাড়াচ্ছে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

তেলের দামের বর্তমান চিত্র ও উত্থানের হার

সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছিল আকাশচুম্বী। বিশেষ করে বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মানদণ্ড ডব্লিউটিআই (ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট)—উভয় ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে।

জ্বালানি তেলের দামের তুলনামূলক চিত্র:

তেলের ধরণ বর্তমান মূল্য (প্রতি ব্যারেল) সাপ্তাহিক বৃদ্ধির হার বিশেষ মন্তব্য
ব্রেন্ট ক্রুড (Brent) ৯৩.০০ ডলার প্রায় ২৮% ২০২৩ সালের শরতের পর সর্বোচ্চ
ডব্লিউটিআই (WTI) ৯০.৯০ ডলার ৩৫.৬৩% এক দিনে বেড়েছে ৯.৮৯ ডলার
সাধারণ পেট্রল (যুক্তরাষ্ট্র) ৩.২৫ ডলার (গ্যালন) ২৭ সেন্ট বৃদ্ধি মার্কিন ভ্রমণ সংস্থা এএএ-র তথ্যমতে

সংঘাত ও বৈশ্বিক প্রভাব

এই মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সরাসরি যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর আহ্বান জানানোয় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের একটি বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই বিশ্ববাজারে পৌঁছায়।

কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তবে নিকট ভবিষ্যতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বিশ্বের জিডিপি প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ধসে পড়ার উপক্রম হতে পারে।

উৎপাদন সংকট ও সরবরাহ বিঘ্ন

যুদ্ধের প্রভাবে উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করতে বাধ্য হচ্ছে। ইরাক ইতিমধ্যে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, কুয়েতও তাদের তেল সংরক্ষণাগারে জায়গা সংকটের কারণে উৎপাদন কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

উপসংহার

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেট হেগসেথের কড়া হুঁশিয়ারি এবং পারস্য উপসাগরে ২০ বিলিয়ন ডলারের বিমা কর্মসূচি ঘোষণা সত্ত্বেও বাজারের উদ্বেগ কমছে না। যদি কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এই যুদ্ধ প্রশমিত না হয়, তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত এক বৈশ্বিক মন্দার পদধ্বনি হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।