খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আলোচনা, বিতর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য রক্ষার যে ঐতিহ্য যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার ব্যত্যয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা এবং তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীর গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সাধারণ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ব্যাপক জনরোষ বা প্রতিবাদ দেখা গেলেও, বর্তমানে মার্কিন সমাজে এক ধরনের স্থবিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আইনের শাসন উপেক্ষার মতো ঘটনাগুলো বারবার ঘটায় জনমনে এক ধরনের ক্লান্তি বা অভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে। এমনকি মুক্তচিন্তার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও প্রতিবাদের ভাষা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ভিসা বাতিল, বহিষ্কার কিংবা আইনি প্রতিহিংসার ভয় এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যা ঐতিহাসিকভাবে স্বৈরশাসিত ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংঘাতের প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সাথে সাথে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতিমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা (Global Supply Chain) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অবকাঠামোসমূহ পুনর্গঠন করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। জ্বালানির পাশাপাশি সার উৎপাদনের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে, যা সরাসরি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন কোভিড-১৯ মহামারির ধকল, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই এই যুদ্ধ নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, বর্তমান অস্থিতিশীলতায় তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নিচে সংঘাতের ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র প্রদান করা হলো:
| খাতের নাম | প্রভাবের প্রকৃতি | দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল |
| জ্বালানি খাত | তেল ও গ্যাস অবকাঠামো ধ্বংস | বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও ঘাটতি। |
| খাদ্য নিরাপত্তা | সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া | খাদ্যশস্যের উৎপাদন হ্রাস ও দাম বৃদ্ধি। |
| মূল্যস্ফীতি | সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট ও শুল্কনীতি | জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মুদ্রার মান হ্রাস। |
| সুদের হার | কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নীতি | গৃহঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণের কিস্তি বৃদ্ধি। |
| প্রযুক্তি খাত | কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় অতিনির্ভরতা | কর্মসংস্থান হ্রাস ও কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা। |
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে বিপুল বিনিয়োগ থেকে। যদি এই খাতের প্রবৃদ্ধি না থাকত, তবে মার্কিন অর্থনীতি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ত। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের করপোরেট কর ছাড়ের নীতির ফলে সরকারের রাজকোষে অর্থপ্রবাহ কমেছে, যা যুদ্ধকালীন সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে সীমিত করে দিচ্ছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেন যে, তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হবে, কিন্তু বাস্তবতা হলো বড় কোম্পানিগুলো লাভবান হলেও সাধারণ জনগণকে বিশ্ববাজারের চড়া দামেই জ্বালানি ক্রয় করতে হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, বর্তমান সংঘাতের ফলে তা হুমকির মুখে পড়েছে। চীনের সাথে চলমান শীতল যুদ্ধ এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের দুর্বলতা ভবিষ্যতের জন্য কোনো ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে না। যে দেশ একসময় বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা প্রদান করত, বর্তমানে তাদের একতরফা নীতি সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই রণকৌশলগত ভুলসমূহ কেবল একটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র বিশ্বের জন্য দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।