খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে বিএনপি নেতা জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, আটক ব্যক্তিরা ঢাকা থেকে ভাড়ায় এসে এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। তবে কারা তাদের ভাড়া করেছিল এবং হত্যার পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মিঠামইন সদর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকায় নিজ বাগানবাড়ির সামনে ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ৫২ বছর বয়সী জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে। হামলার সময় তাকে রক্ষা করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন স্থানীয় বিএনপি কর্মী হাদিস মিয়া (৩৮)। বর্তমানে তিনি কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, আটক তিনজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা হত্যার উদ্দেশ্যে তিন দিন আগে ঢাকা থেকে মিঠামইনে আসেন। হামলার পর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ঘটনাস্থল থেকে একজনকে আটক করা হয়। পরে জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে বুধবার গভীর রাতে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন বরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া এলাকার মৃত সুলতানের ছেলে মো. হেলাল (২৫), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর এলাকার নূর হোসেনের ছেলে মহিন উদ্দিন (৩২) এবং একই উপজেলার নাগমুদ বাজার মধ্যপাড়া এলাকার রহমত উল্লাহর ছেলে শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫)।
পুলিশ সুপার বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং কী কারণে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আটক ব্যক্তিদের অতীত অপরাধের রেকর্ডও যাচাই করা হচ্ছে। তিনি জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর ও হাদিস মিয়া মোটরসাইকেলে করে মিঠামইন সদর বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে ওঁত পেতে থাকা তিন হামলাকারী ধারালো চাপাতি নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপ দেওয়া হয়।
আহত হাদিস মিয়ার বড় ভাই আজিজুল কবির জানান, হাদিস কোনো সাংগঠনিক পদে না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। হামলার সময় তিনি সাহসিকতার সঙ্গে একজন হামলাকারীকে জাপটে ধরেন। এতে হামলাকারীরা তার মাথা, হাত ও পায়ে একাধিক কোপ দেয়। গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি হামলাকারীকে ছাড়েননি। পরে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে ওই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
গুরুতর আহত দুইজনকে দ্রুত কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন। হাদিস মিয়ার চিকিৎসা এখনও চলমান।
নিহতের ছোট ভাই এবং জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, শুক্রবার জুমার নামাজের পর মিঠামইনের পারিবারিক কবরস্থানে জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে দাফন করা হবে।
এদিকে জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম। তারা হত্যাকারীদের পাশাপাশি এই হত্যার পরিকল্পনাকারীদেরও দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষাপটও আলোচনায় এসেছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মিঠামইনের বেড়িবাঁধ এলাকার সরকারি ২০টি মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। একই দিনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে তার প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পদ স্থগিত করা হয়। প্রায় এক মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরে ৫ জুলাই তার সভাপতির পদে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হলেও সেই সিদ্ধান্তের চিঠি তার মৃত্যুর পর প্রকাশ্যে আসে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনে জড়িত অন্য ব্যক্তি বা পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য