খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলার লোকসাহিত্যের অনন্য পুরোধা, বিশিষ্ট সংগ্রাহক ও গবেষক মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের নাম আজো শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হয়। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত।
১৯০৪ সালে পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার মুরারিপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা জায়দার আলী এবং মাতা জিউয়ারুন নেসার স্নেহধন্য এই সন্তান অল্প বয়স থেকেই মনোনিবেশ করেছিলেন জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যপাঠে। ১৯২১ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবাশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ধাপে ধাপে এগিয়ে যান উচ্চশিক্ষার পথে। ১৯২৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগে কোনো মুসলিম ছাত্র এই কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেননি।
ছাত্রজীবনেই লোকসাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়। প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত লালনের গান পড়েই অনুপ্রাণিত হন তিনি। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ প্রেরণায় শুরু করেন লালন ও অন্যান্য বাউল-ফকিরদের গান সংগ্রহের মহৎ কর্মযজ্ঞ। তাঁর প্রথম সংগৃহীত গান ছিল নিজ গ্রামের প্রেমদাস বৈরাগীর কাছ থেকে পাওয়া লালনের একটি গান, যা প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকার ১৩৩০ সালের আশ্বিন সংখ্যায়।
তাঁর শ্রম ও নিষ্ঠার ফসল হারামণি—তেরো খণ্ডে প্রকাশিত অমূল্য লোকসাহিত্য সংগ্রহ, যা আজ বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অক্ষয় সম্পদ। একইসঙ্গে তিনি রচনা করেছেন গবেষণাগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা (তিন খণ্ড) সহ মোট ৪২টি বই।
শিক্ষাক্ষেত্রেও ছিল তাঁর অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৩১ সালে স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন এবং অবশেষে ১৯৫৯ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেন। ১৯৫২ সালে মাহে নও পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছিলেন কিছু সময়ের জন্য।
লোকসাহিত্য সংগ্রাহক হয়েও তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবনের একটি অংশ কেটেছে ঢাকায়। হুঁকো-বিলাস, জুতাপ্রীতি, ইংরেজি ভাষার প্রতি আকর্ষণ—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক বিস্ময়কর বৈচিত্র্যময় মানুষ। বাউল-ফকিরদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁকে করেছে তাঁদেরই একজন।
অমূল্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন বহু সম্মাননা
১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার
১৯৭৬ সালে একুশে পদক (শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান)
১৯৮৪ সালে স্বাধীনতা পদক (সাহিত্যে অবদান)
১৯৮৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। তবে তাঁর সংগ্রহ ও সাধনার ধারা চিরকাল বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে আলোকিত করবে।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি মহান এই লোকসাহিত্য সংগ্রাহককে— যিনি বাঙালির লোকঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন এক বিশ্বমানবের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
খবরওয়ালা/এমএজেড