খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) চারটি শাখা তীব্র মূলধন সংকটের কারণে বন্ধের মুখোমুখি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারায় শাখাগুলোর বিদ্যমান কার্যক্রম ধাপে ধাপে গুটিয়ে ফেলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই)।
সম্প্রতি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সিবিইউএই ইতিমধ্যে জনতা ব্যাংকের এই শাখাগুলোর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার ওপর (ডেবিট লেনদেন) কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। একই সঙ্গে নতুন কোনো গ্রাহক হিসাব বা অ্যাকাউন্ট খোলা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, বর্তমানে সেখানে কার্যরত কোনো বিদেশি ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন হতে হবে ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম। অথচ জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখাগুলোর বর্তমান পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১০০ মিলিয়ন দিরহাম। ফলে ব্যাংকটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০০ মিলিয়ন দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা (প্রতি দিরহাম ৩৩.৫০ টাকা হিসেবে)। এর আগে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে জনতা ব্যাংক ইউএই শাখার পরিশোধিত মূলধন ৭৫ মিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ১০০ মিলিয়ন দিরহামে উন্নীত করলেও তা বর্তমান নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের জন্য যথেষ্ট হয়নি।
এই কঠোর নির্দেশনা জানিয়ে সিবিইউএইর সহকারী গভর্নর আহমেদ সাঈদ আল কামজি গত ৮ জুলাই জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে এই বিষয়টি জনতা ব্যাংকের ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদকে দ্রুত অবহিত করার এবং পর্ষদের সিদ্ধান্ত জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ৯ জুলাই ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।
চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ জুলাই জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮৮৪তম সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, এই সংকট মোকাবেলায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সমন্বয়ে একটি জরুরি যৌথ বৈঠক করা প্রয়োজন।
ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের চিঠিতে কেবল মূলধন ঘাটতির কথাই বলেনি, বরং বাংলাদেশে জনতা ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রমের সংকটাপন্ন পরিস্থিতি ও ভঙ্গুর আর্থিক অবস্থার কথাও উল্লেখ করেছে। পর্যাপ্ত মূলধন না থাকলে প্রবাসী ও স্থানীয় গ্রাহকদের আমানত চরম ঝুঁকিতে পড়ে যায় বলে সিবিইউএই এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ মজিবুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত নিয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেরই উদ্বেগ রয়েছে। জাতীয়ভাবে ব্যাংক খাতে ২০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ অবশ্যই চিন্তার বিষয়। আর জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে মোট ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে এই সংকটের মধ্যেও ব্যাংকটি সচল রয়েছে। আমরা নিয়মিত কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করছি, সরকারের পাশাপাশি সাধারণ এলসি (ঋণপত্র) খুলছি এবং নিজস্ব তহবিল থেকে প্রতি মাসে ১২৫ কোটি টাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিচ্ছি।”
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি বিশেষ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, তারা আগামী তিন বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এই ৩০০ মিলিয়ন দিরহামের ঘাটতি পূরণ করে মোট পরিশোধিত মূলধন ৪০০ মিলিয়ন দিরহামে উন্নীত করার একটি সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা জমা দিয়েছেন।
যদি ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কিস্তিতে মূলধন বাড়ানোর প্রস্তাবে রাজি না হয়, তবে জনতা ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে বাংলাদেশ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি আর্থিক সহায়তা নিয়ে এই ১,০০০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি পূরণ করবে। ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা আশাবাদী যে, সরকারের সহযোগিতায় দ্রুতই এই সংকট কাটিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংক আবার পূর্ণ শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।