রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পের কাছে কথিত একটি নাগরিক সংগঠনের মাদকবিরোধী অভিযানে আরিফ হোসেন (৩০) নামের এক যুবকের মাথা ফেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রোববার রাত ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের পাশের ফুটপাথে এ ঘটনা ঘটে। আহত আরিফের মাথায় চারটি সেলাই দিতে হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে অভিযানে কারা অংশ নিয়েছিলেন, পুলিশ সেখানে উপস্থিত ছিল কি না এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরনের অভিযান পরিচালনার এখতিয়ার কতটুকু—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজের দপ্তরের লোকজন জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালান। এ সময় মাদক সেবনের অভিযোগে আরিফকে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের গেটের কাছে পুলিশের গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়।
এরপর পুলিশ তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসা শেষে তাঁকে থানায় নেওয়া হয়। পুলিশের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরিফের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
তবে অভিযানটি ঠিক কারা পরিচালনা করেছেন এবং সেখানে পুলিশের ভূমিকা কী ছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে অসংগতি পাওয়া গেছে। মোহাম্মদপুর থানার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথমে বলেন, রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের পাশের সড়কের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। এ কারণে স্থানীয় নাগরিক সমাজের সদস্যসহ কয়েকটি পক্ষ মিলে সেখানে অভিযান চালায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় আরিফ গাঁজা সেবন করছিলেন এবং ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তিনি আহত হন।
পরে ওই কর্মকর্তা ফোন করে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত না করার অনুরোধ জানান। তখন তিনি বলেন, পুলিশ আরিফকে আটক করেনি; স্থানীয় লোকজন তাঁকে ধরে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। আরিফ মাদক সেবন করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁকে ডোপ টেস্টের জন্য পাঠানো হয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
ঘটনাটি নিয়ে ববি হাজ্জাজের দপ্তরের বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ইনতিশার মাশুক প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের দপ্তরের লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো এবং এক যুবকের মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইনতিশার বলেন, ওই এলাকায় একটি নাগরিক সংগঠন রয়েছে, যারা মাঝেমধ্যে এ ধরনের অভিযান চালায়। তবে এ অভিযানের সঙ্গে সংসদ সদস্যের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ববি হাজ্জাজের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো অভিযান পরিচালনা করা হয়নি।
ফলে অভিযানটির আয়োজক কারা ছিলেন, আরিফ কীভাবে আহত হলেন এবং ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি সম্পর্কে পাওয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের বিষয়গুলো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর আগে শনিবার রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তাঁর ওই অভিযান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় সোমবার প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি।
পরপর এসব ঘটনা রাজধানীতে মাদকবিরোধী অভিযানের ধরন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং ব্যক্তিগত বা নাগরিক উদ্যোগে পরিচালিত অভিযানের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা সামনে এনেছে। মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এ ধরনের উদ্যোগে কারা অংশ নেবেন, কীভাবে অভিযান পরিচালিত হবে এবং কোনো ব্যক্তি আহত হলে দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া কী হবে—সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।


