খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একে অপরের সমার্থক হয়ে আছে। ফুটবল দুনিয়ায় একক নৈপুণ্য আর অতিমানবীয় পারফরম্যান্স দিয়ে যে দল চ্যাম্পিয়ন করা যায়, ম্যারাডোনা তৎকালীন মেক্সিকোর সবুজ মাঠে সেটি প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। সেই আসরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটি শুধু ফুটবলের কারণেই নয়, জড়িয়ে ছিল মাঠের বাইরের রাজনৈতিক তীব্র উত্তেজনাতেও। আজ রাতে আটলান্টায় আরেকটি রোমাঞ্চকর ম্যাচে একে অপরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ। বিশ্বমঞ্চের এই সেমিফাইনাল লড়াইকে কেন্দ্র করে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালটি আর দশটি সাধারণ ম্যাচের মতো ছিল না। কারণ, ১৯৮২ সালের ঐতিহাসিক ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’কে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক সম্পর্ক তখন ভীষণ বৈরী ও সংকটাপন্ন। যুদ্ধের ক্ষত তখনো দুই দেশের মানুষের হৃদয়ে দগদগে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়া মানে ছিল যেন মাঠের ভেতরেই আরেকটি প্রতীকী যুদ্ধ।
সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচে একা হাতে খেলার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তাঁর অসাধারণ জোড়া গোলের ওপর ভর করে ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের প্রথম গোলটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়, যা পরে খোদ ম্যারাডোনার মুখেই ‘হ্যান্ড অফ গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে পরিচিতি পায়। এর কিছুক্ষণ পরই মাঠে বিশ্ববাসী দেখে এক অবিশ্বাস্য ম্যাজিক। মধ্যমাঠ থেকে বল কেড়ে নিয়ে একে একে ইংল্যান্ডের পাঁচজন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোলটি করেন তিনি, যা পরবর্তীতে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র তকমা পায়। আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এই জয় ছিল মাঠের বাইরে হারিয়ে যাওয়া ফকল্যান্ড দ্বীপের এক তীব্র প্রতীকী প্রতিশোধ।
আজকের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে চাঙ্গা করতে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের ভিডিওগুলো ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। আর্জেন্টিনার তারকা মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক আলিস্টার জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ম্যারাডোনার সেই সব স্মরণীয় মুহূর্তের ভিডিও ক্লিপগুলো তাঁদের রোমাঞ্চিত করছে।
আটলান্টায় সেমিফাইনাল খেলতে নামার আগে ডিয়েগো ম্যারাডোনোর সেই অদম্য চেতনাকে মাঠে বাস্তবায়ন করতে চায় আলবিসেলেস্তেরা। লিভারপুলের এই মিডফিল্ডার নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ডিয়েগো কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি তাঁদের দেশের গৌরব ও ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রতীক। দলের প্রত্যেকেই আজ সেই অদম্য জেদ নিয়ে খেলবেন। তাঁরা আশা করছেন, ১৯৮৬ সালের সেই বীরত্বগাথা পুনরাবৃত্তি করে আজ নতুন এক মাইলফলক ছুঁতে পারবেন।
ম্যাক আলিস্টার বিশ্বাস করেন, ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে এককভাবে যা করেছিলেন, তা সাধারণ কারও পক্ষে করা প্রায় অসম্ভব। তবে আধুনিক ফুটবলে এমন অতিমানবীয় কীর্তি যদি কেউ করতে পারেন, তিনি হলেন দলের প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি।
আজ আটলান্টার মাঠজুড়ে থাকবে স্নায়ুচাপ ও চরম উত্তেজনা। আর্জেন্টিনার লক্ষ্য, মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্স ও ম্যারাডোনার অসীম অনুপ্রেরণাকে ঢাল করে ইংলিশ বাহিনীকে পরাস্ত করা। অন্যদিকে, ইংরেজদের লক্ষ্য থাকবে অতীতের প্রতিশোধ আর ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করা। ফুটবল দুনিয়ার সমস্ত চোখ এখন আটলান্টার এই জমজমাট সেমিফাইনাল দ্বৈরথের ওপর।